টরন্টোর বুকে ফিরে এলো ঢাকার নাট্যমঞ্চের আবহ, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’র সফল মঞ্চায়ন

আটলান্টিকের ওপারে বরফঘেরা কানাডার অন্যতম প্রধান শহর টরন্টোতে যেন কিছু সময়ের জন্য জীবন্ত হয়ে উঠেছিল ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চ কিংবা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চিরচেনা নাট্যশালা অডিটোরিয়াম৷ টরন্টোর ফেয়ারভিউ মল লাইব্রেরি থিয়েটারের (Fairview Mall Library Theatre) সুসজ্জিত মঞ্চে প্রবাসীদের উপচে পড়া ও আবেগঘন উপস্থিতির মধ্য দিয়ে স্থানীয় সময় গত রোববার সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হলো বিশ্ববিখ্যাত ও বহুল আলোচিত নাটক ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’৷

টরন্টোর জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘প্রাচ্য-প্রতীচ্য’র ব্যানারে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়৷ জার্মান নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেখটের কালজয়ী নাটক অবলম্বনে নির্মিত জনপ্রিয় এই প্রযোজনার নির্দেশনায় ছিলেন বাংলাদেশের বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনেতা মাহমুদুল ইসলাম সেলিম৷

দূর প্রবাসে পেশাগত ব্যস্ততা, যান্ত্রিক জীবন ও নাট্যচর্চার নানামুখী অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে কলাকুশলীদের প্রাণবন্ত অভিনয় দর্শকদের পুরোপুরি মুগ্ধ করে৷ কানায় কানায় পূর্ণ মিলনায়তনে উপস্থিত নাট্যপ্রেমী দর্শকেরা নাটকের শুরু থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত পিনপতন নীরবতায় এবং তুমুল আনন্দের সাথে উপভোগ করেন৷ নাটকের গতিশীল অভিনয়, চমৎকার আলোকসম্পাত, সুতীক্ষ্ণ সংলাপ ও প্রতিটি দৃশ্যের বৈপরীত্যের আবেগে হলজুড়ে বারবার প্রশংসার তুমুল করতালির ঝড় ওঠে৷

নাটক শেষে টরন্টো প্রবাসী দর্শকদের ভালোবাসার জবাবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের নব্বই দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় নাট্যাভিনেত্রী আফরোজা বানু, বিশিষ্ট অভিনেত্রী লুৎফর নাহার লতা, নির্দেশক মাহমুদুল ইসলাম সেলিম এবং প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সহসভাপতি শিবু চৌধুরী৷

নাট্যাভিনেত্রী লুৎফর নাহার লতা তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন— ‘দূর প্রবাসে জীবনের হাজারো ব্যস্ততা আর কঠোর নিয়মের মধ্যেও মাহমুদুল ইসলাম সেলিমের নির্দেশনায় বাংলা নাটকের এমন সফল ও নিখুঁত মঞ্চায়ন সত্যিই প্রশংসার দাবিদার৷ এই নাটকের অভিনেতা-কলাকুশলীদের পাশাপাশি উপস্থিত অসাধারণ দর্শকরাও আজ এই বিরাট সাফল্যের সমান অংশীদার৷’ তিনি প্রবাসের বুকে আবহমান বাংলার নাট্যঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের এমন অনন্য উদ্যোগ নিয়মিত অব্যাহত রাখার জোর আহ্বান জানান৷

দেওয়ান গাজীর কিসসা’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র দেওয়ান গাজী মূলত গাজীপুর এলাকার এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী জোতদার৷ ক্ষমতার প্রচণ্ড লালসা, নারকীয় ভোগ-বিলাস, লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাগলামি করে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতার মধ্য দিয়ে চরিত্রটি গড়ে উঠেছে৷ এই জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমাজে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং মানুষের চারিত্রিক অবক্ষয়ের এক শক্তিশালী চিত্র নাট্যভাষায় তুলে ধরা হয়েছে, যা বর্তমান সমাজের সাথে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক৷

মঞ্চায়ন শেষে হল থেকে বের হওয়ার সময় নাটক দেখতে আসা প্রবাসী দর্শকদের অনেকেই মন্তব্য করেন— টরন্টোতে এর আগে কোনো একটি বাংলা নাটকের মঞ্চায়নে এমন অভাবনীয় দর্শক সমাগম, পিনপতন নীরবতা ও এত প্রাণবন্ত আয়োজন খুব কমই দেখা গেছে৷ দর্শকদের মতে— ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’র এই আয়োজন টরন্টোর মাটিতে শুধু একটি ভালো নাটক ছিল না, বরং তা প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা বাংলা সংস্কৃতি ও নাট্যকলা চর্চার প্রতি নতুন প্রজন্মের ভালোবাসার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *