দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ তীব্র ক্যাশ-ফ্লো বা আর্থিক চাপে পড়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধে বড় ধরণের সংকটে পড়েছে৷ দেশি ও বিদেশি মোট ৪৭টি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রুপটির বর্তমান পুঞ্জীভূত ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৮৪ কোটি টাকারও বেশি৷
বিদ্যমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক প্রতিকূলতার কথা তুলে ধরে গ্রুপটি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজেদের ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করার জন্য আবেদন করেছিল৷ সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ’ (এবিবি)-এর জোরালো তদবিরের মুখে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ৩৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে আগামী তিন মাস সিটি গ্রুপকে খেলাপি না করার বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে৷ এর ফলে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রুপটির ঋণ বর্তমানে যে মানে শ্রেণিকৃত রয়েছে, ঠিক সেই মানই বহাল থাকবে৷
বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া শর্ত ও গভর্নরের বার্তা: ব্যাংকগুলোয় পাঠানো চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে— ব্যাংকার-গ্রাহক সুসম্পর্কের ভিত্তিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখা যাবে৷ তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে শ্রেণিকরণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই প্রকৃত আয় ছাড়া ঋণ হিসাবে আরোপিত সুদ ব্যাংকগুলোর মূল আয় খাতে নেওয়া যাবে না৷
আজ এক মুদ্রানীতি অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সিটি গ্রুপের এই বিশাল সংকট প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন— “এ সংকট সমাধানে কাজ চলছে, যেগুলো বাস্তবায়ন হলে কোম্পানিটি এই সাময়িক সমস্যা থেকে সফলভাবে বেরিয়ে আসতে পারবে৷ আমরা দেশের তিনটি শীর্ষ ব্যাংকের এমডিকে নিয়ে বসেছিলাম এবং তাদের একটি বাস্তবসম্মত টেকসই সমাধান বের করতে বলেছি৷ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সহযোগিতা করবে৷”
চার বছরের দ্বিমুখী সংকট ও ডলারের ধাক্কা: প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কখনো খেলাপি না হওয়া সিটি গ্রুপ গভর্নরের কাছে দেওয়া আবেদনে জানিয়েছে— গত চার বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়হার ৮৬ টাকা থেকে ১২২ টাকায় উন্নীত হওয়ায় প্রায় ৪২ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে৷ যেহেতু তাদের অধিকাংশ কাঁচামাল ডলারে স্বল্পমেয়াদি ঋণের মাধ্যমে আমদানি করতে হয়, তাই বিনিময়হার বৃদ্ধির ফলে তাদের বিদ্যমান ঋণসীমার ডলার সমমূল্য প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার কমে গেছে, ফলে পর্যাপ্ত এলসি (LC) খুলে কাঁচামাল আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়েছে৷
পাশাপাশি দেশীয় ঋণের সুদের হার ৪-৫ শতাংশ এবং ডলারের ঋণের সুদ ২০২২ সালের ৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে একলাফে ৯-১০ শতাংশে পৌঁছেছে৷ তীর, সান ও ন্যাচারাল ব্র্যান্ডের মাধ্যমে দেশের মোট ভোজ্যতেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ, চিনির ৪০ শতাংশ এবং আটার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহকারী এই গ্রুপটির উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক বাড়লেও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রিত থাকায় ভোক্তার ওপর সেই ব্যয় পুরোপুরি চাপানো সম্ভব হয়নি৷ ফলে গত চার বছরে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি৷
বিপদের মূল কারণ ‘হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চল’: শীর্ষ ব্যাংকার ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে— গ্রুপের ঋণমান পরিবর্তন বা ৩ মাসের সময় দিলেই এই বিশাল সংকট কাটবে না৷ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ‘হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তুলেছিল সিটি গ্রুপ, যেখানে ছয়টি বৃহৎ শিল্পকারখানা স্থাপনে গ্রুপটির প্রায় ১০ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার বিপুল বিনিয়োগ ছিল৷ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত গ্যাস বরাদ্দের ভিত্তিতে কারখানা গড়ে তুললেও পেট্রোবাংলা ও তিতাস এখনো সেখানে গ্যাসের সংযোগ দিতে পারেনি৷ ফলে বিপুল বিনিয়োগে গড়ে তোলা কারখানাগুলো এখন সম্পূর্ণ অলস পড়ে রয়েছে৷ উৎপাদনে যেতে না পারায় গ্রুপটি এখন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে তীব্র চোরাবালিতে পড়েছে৷ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের ঝুঁকি পর্যালোচনা না করে কেবল সুনামের ওপর ভিত্তি করে গ্রুপটিকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলোও নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছে৷
ঋণের তালিকায় কোন কোন ব্যাংক? ঋণের ডাটাবেজ অনুযায়ী— সিটি গ্রুপকে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে বিদেশি দুই ব্যাংক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড৷ এর মধ্যে এইচএসবিসির ঋণ স্থিতি ২ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২ Count হাজার ৫১ কোটি টাকা৷ দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে সিটি ব্যাংক (১,১৪০ কোটি), ইউসিবি (১,১৬৭ কোটি), ইস্টার্ন ব্যাংক (১,১৫৮ কোটি), পূবালী ব্যাংক (১,১৪৫ কোটি), প্রাইম ব্যাংক (১,০৪৭ কোটি), মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (১,০৭৮ কোটি) এবং ব্র্যাক ব্যাংকের (৯৮৬ কোটি) কাছে৷
এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন— “তিন মাস ঋণ খেলাপি না করার আইনি সুযোগ অবশ্যই একটি ইতিবাচক তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ৷ তবে শুধুমাত্র তিন মাস ঋণ নিয়মিত থাকলেই সংকট সম্পূর্ণ কেটে যাবে না৷ সিটি গ্রুপের টেকসই পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে তাদের উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার ওপর৷ ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এ মুহূর্তে একটি বড় পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করছে৷”
