ফিফার সাথে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে; ২০২৬ বিশ্বকাপ সরাসরি দেখানোর প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ টেলিভিশন

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠেয় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের মাঝে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অবশেষে কেটে যেতে চলেছে. বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA)-এর মধ্যে চলমান আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এ সরাসরি বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো সম্প্রচারের জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে.

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বিটিভি-এর একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র গত বুধবার নিশ্চিত করেছে যে, এই সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলছে. যদি এই চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পায়, তবে রাষ্ট্রায়ত্ত এই গণমাধ্যমটি সারা বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীদের জন্য বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো সরাসরি সম্প্রচার করবে.

এই আলোচনা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি না হলেও, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আলোচনা সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে. স্থানীয় গণমাধ্যমকে মন্ত্রী বলেন, “আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি যেন দেশের সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের সরকারি তহবিল বা জনগণের টাকা খরচ না করেই বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো সরাসরি উপভোগ করতে পারেন.”

আগামী ১১ জুন থেকে ফুটবলের এই মেগা আসর শুরু হতে যাচ্ছে. এর আগে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড’ (Springbok Pte Ltd) বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপের মূল সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল এবং স্থানীয় সম্প্রচারকদের কাছে সাব-লাইসেন্স বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিল. সূত্র মতে, কোম্পানিটি বিটিভির কাছে এই স্বত্বের জন্য প্রায় ১৫১ কোটি টাকা দাবি করে, যা কর বা ট্যাক্সসহ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াত. বিশাল এই অঙ্কের কারণে তখন চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেনি.

পরবর্তীতে কোনো স্থানীয় ক্রেতা বা বায়ার খুঁজে না পেয়ে স্প্রিংবক তাদের সম্প্রচার স্বত্বটি ফিরিয়ে দেয় বলে জানা গেছে. এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার সরাসরি ফিফার সাথে আলোচনা শুরু করে. তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং বিটিভির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো আর্থিক খরচ ছাড়াই এই সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়ার লক্ষ্যে বেশ কয়েক দফা সফল বৈঠক করেছেন.

কর্মকর্তারা অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, আগামী দু-একদিনের মধ্যেই এই আলোচনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে. চুক্তি সম্পন্ন হলে বিটিভি বিশ্বকাপের মূল সম্প্রচার স্বত্ব লাভ করবে এবং যেসব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল খেলা দেখাতে আগ্রহী, তাদের বিটিভির কাছ থেকে সাব-লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে.

টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও খেলা দেখার সুযোগ থাকছে. দেশের জনপ্রিয় ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম ‘টফি’ (Toffee) ইতোমধ্যে বাংলালিংকের সাথে যৌথভাবে বিশ্বকাপের ডিজিটাল স্ট্রিমিং স্বত্ব নিশ্চিত করেছে. ফলে ফুটবল ভক্তরা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো সরাসরি দেখতে পাবেন.

উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে জটিলতায় পড়া একমাত্র দেশ বাংলাদেশ নয়. ভারত এবং চীনের ফুটবল ভক্তরাও এই টুর্নামেন্ট দেখা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছিল. তবে সম্প্রতি ফিফা ২০২৬ ও ২০৩০ সালের পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ ও ২০৩১ সালের নারী বিশ্বকাপের জন্য ‘চীন মিডিয়া গ্রুপ’-এর সাথে চুক্তি করেছে. অপরদিকে ভারতের জন্য এই সম্প্রচার স্বত্ব দেওয়া হয়েছে ‘জি এন্টারটেইনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেস’-কে.

এর আগে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে বিটিভি ‘প্যাকেজ-শেয়ারিং’ পলিসির আওতায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খেলা দেখিয়েছিল, যা পরে বাতিল করা হয়. পরবর্তীতে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় সরকার বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে প্রায় ৯৮ কোটি টাকায় সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল. তবে এবার কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় না করেই কোটি দর্শকদের জন্য বড় পর্দায় খেলা দেখানোর এই ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *