চট্টগ্রামে ৪৩ বছরের রেকর্ডভাঙা অতি ভারী বর্ষণে মহাবিপর্যয়

সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রবল প্রভাব এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে টানা পঞ্চম দিনের মতো রেকর্ডভাঙা ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণে কার্যত সম্পূর্ণ স্তব্ধ ও স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগরের স্বাভাবিক জনজীবন৷ আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও আমবাগান আবহাওয়া কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী— গত ২৪ ঘণ্টায় নগরের পিবিও আমবাগান এলাকায় রেকর্ড ৩৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে৷ এর মধ্যে কেবল সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টাতেই ৩৩ মিলিমিটার মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে৷ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে— চলতি রানিং বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১৩ মিলিমিটারে৷ এর আগে গত মঙ্গলবার একদিনেই ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল, যা বিগত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড৷ কয়েক দিনের এই অবিরাম জলতাণ্ডবে নগরের নিচু এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়ক, অলিগলি এবং আবাসিক এলাকাগুলোতে কোমরসমান পানি জমে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে৷

পানিবন্দি বাকলিয়া ও বায়েজিদ; সড়কে রানিং ভাড়া নৈরাজ্য: টানা পাঁচ দিনের এই বর্ষণে সবচেয়ে বেশি মানবিক দুর্ভোগে পড়েছেন চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ বাসিন্দারা৷ গতকাল বুধবার থেকে নগরজুড়ে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে সমস্ত প্রকার যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল৷ আজ বৃহস্পতিবার নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা চরম রূপ ধারণ করেছে৷ বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, ওয়াসা মোড়, কাতালগঞ্জ, লালখান বাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহর, মুরাদপুর, নতুন ব্রিজ, চকবাজার, বায়েজিদ ও খতিবেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকার মূল সড়কে পানি জমে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে৷

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বাকলিয়া থানাধীন নোমান কলেজ রোড, মহব্বত নগর, বাস্তুহারা ও খেতচর এলাকায়৷ টানা পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে এসব এলাকা প্লাবিত থাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন৷ প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক এখন নৌকার রানিং চ্যানেলে পরিণত হয়েছে৷ কর্মজীবীরা সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না এবং অনেক পরিবারে উনুন বা রান্নাবান্না সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে৷ এই তীব্র বৃষ্টির কারণে গণপরিবহন সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা চালিয়েছেন প্রকাশ্য ভাড়া নৈরাজ্য৷ নতুন ব্রিজ থেকে কাজীর দেউড়ি পর্যন্ত সিএনজি ভাড়া ১২০ টাকার পরিবর্তে আদায় করা হচ্ছে ২০০ টাকা, বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ ৩৫০ টাকা, কল্পলোক থেকে লালখান বাজার ২৭০ টাকা এবং বাকলিয়া থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কোনো কোনো অসহায় যাত্রীর কাছ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ শাহ আমানত সেতু এলাকাতেও স্বল্প দূরত্বে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে৷ চালকদের দাবি— সড়কে জমে থাকা পানির কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ বিকল হওয়ার ঝুঁকি ও ধীরগতির কারণেই তারা বাড়্তি ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন৷

নগরের বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন— চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরে প্রধান নালা ও খালগুলো পুরোপুরি পরিষ্কার না করায় এবং নালার ভেতরে পলি ও ভারী আবর্জনা জমে থাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে না৷ এ ছাড়া বহু সড়কে নালাগুলোর উচ্চতা রাস্তার চেয়ে বেশি হওয়ায় বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে কর্ণফুলী নদীতে নামতে পারছে না৷

সাগর উত্তাল; চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল জট: অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার এক প্রলয়ঙ্কারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে৷ উত্তর বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের কারণে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে৷ ফলে মাদার ভেসেল (বড় মাদার জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজে খোলা পণ্য খালাস কার্যক্রম প্রায় শতভাগ বন্ধ হয়ে গেছে৷ বন্দর ও ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সূত্র জানায়— বুধবার থেকে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বহির্নোঙরে প্রায় ৫২টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে অলস অবস্থান করছে৷ এসব জাহাজে রয়েছে কোটি কোটি টাকার ভোজ্য তেল, চিনি, সিমেন্ট ক্লিংকার, কয়লা ও সারসহ বিভিন্ন ধরনের আমদানি করা পণ্য৷

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানান— সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত চার-পাঁচ দিন ধরে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে৷ লাইটার জাহাজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে৷ কিছু লাইটার জাহাজ কর্ণফুলী নদীর উজানে এবং যেগুলো নদীতে প্রবেশ করতে পারেনি সেগুলো পতেঙ্গা উপকূলে অবস্থান করছে৷ এমনকি একটি লাইটার জাহাজ পতেঙ্গা উপকূলের পাথরে আটকে যাওয়ার দুর্ঘটনাও ঘটেছে৷ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা লাইটার জাহাজগুলোকে হাতিয়া ও চাঁদপুর এলাকায় রানিং ওয়েটিংয়ে রাখা হয়েছে৷

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করে বলেন— “বৈরী আবহাওয়ার কারণে বহির্নোঙরে খোলা পণ্য খালাস ব্যাহত হলেও যেসব কনটেইনার ও পণ্য বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই, সেগুলোর সীমিত খালাস চলছে৷ জেটি ও ইয়ার্ডে অভ্যন্তরীণ লোড-আনলোড স্বাভাবিক রয়েছে৷” চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন— “খাল, নালা ও ড্রেনের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন স্পটে জরুরি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও সার্বক্ষণিক মনিটরিং চলছে৷ চসিকের বিশেষ দল রানিং অ্যাকশনে আছে৷” তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগামী ৪৮ ঘণ্টার অতি ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসের কড়া পূর্বাভাসে নগরবাসীর চোখে-মুখে এখন নতুন করে চরম আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *