বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে প্রচারণার ধরনে। আগের মতো শুধু মাঠের জনসভা, পোস্টার বা মিছিলেই সীমাবদ্ধ নেই রাজনৈতিক বার্তা—এখন ভোটের লড়াই সমানতালে চলছে টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের স্ক্রিনে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে রাজনৈতিক দলগুলো বেছে নিয়েছে গান, শর্ট ভিডিও, রিলস, আবেগী গল্প এবং ব্যঙ্গধর্মী কনটেন্ট।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় একটি নির্বাচনি গান। গানের কথায় প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতীকগুলোকে পাশ কাটিয়ে দাঁড়িপাল্লাকে বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই গানের মাধ্যমে মূলত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বাইরে নতুন রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। গানটির নির্মাতা প্রবাসী এক সংগীতশিল্পী জানান, এটি শুরুতে নির্দিষ্ট এক প্রার্থীর জন্য তৈরি হলেও ভাইরাল হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হতে থাকে।
এর পাল্টা হিসেবে বিএনপিও প্রকাশ করেছে নিজস্ব প্রচারণামূলক সংগীত, যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একই সময়ে ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর আত্মপ্রকাশ করা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) অফিসিয়াল গানও অনলাইনে তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও নির্বাচনি মাঠের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি, বাস্তবে ডিজিটাল প্রচারণা চলছে অনেক আগ থেকেই। লক্ষ্য মূলত ‘জেন জি’ ভোটাররা—যাদের একটি বড় অংশ ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল এবং এবার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।
গানের পাশাপাশি নাটকীয় শর্ট ভিডিও, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, সাধারণ ভোটারের আবেগী বক্তব্য ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টে ভরে উঠেছে সামাজিক মাধ্যম। এর মধ্যেই জুলাই জাতীয় সনদকে কেন্দ্র করে গণভোটের বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে এই সনদের পক্ষে অনলাইন প্রচারণা জোরদার করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ডিজিটাল মাধ্যম এখন আর প্রান্তিক নয়। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার বড় অংশ। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের ব্যবহারকারী সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে, আর ভোটার তালিকায় ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সীদের অংশ প্রায় ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ তরুণদের মন জয়ের লড়াই মানেই ডিজিটাল স্পেস দখলের প্রতিযোগিতা।
এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত দুই জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট যেখানে এনসিপিও রয়েছে। দুই পক্ষই অনলাইনে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। বিএনপি নীতিনির্ভর আলোচনায় জোর দিয়ে চালু করেছে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ভোটাররা মতামত দিতে পারছেন। জামায়াতও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ইশতেহার তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আলাদা ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির কনটেন্টে উন্নয়ন ও প্রতিশ্রুতি তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, আর জামায়াতঘেঁষা কনটেন্টে বিএনপিকে পুরনো রাজনৈতিক ধারার অংশ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রবিরোধী বার্তাও মিম ও শর্ট কনটেন্টের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ডিজিটাল প্রচারণা এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখলেও বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও আসে ব্যালট বাক্স থেকেই। তবে অনলাইনে তৈরি হওয়া আলোচনা, আবেগ ও ট্রেন্ড যে তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে প্রায় সবাই একমত।
