ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পুত্র এবং দেশটির ভাবি উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই সম্পূর্ণ লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন৷ কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে— ইরানে চলমান আয়াতুল্লাহ খামেনির ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও তিনি সশরীরে অংশ নিচ্ছেন না৷ মূলত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাজনিত চরম হুমকি এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন মোসাদ হামলা বা ড্রোন থেকে সুনির্দিষ্ট হত্যাচেষ্টার (টার্গেটেড কিলিং) আশঙ্কার কারণেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে৷
গত ফেব্রুয়ারি মাসে পেন্টাগন ও তেল আবিবের যৌথ বিমান হামলার পর থেকেই জনসমক্ষে বা কোনো ধরণের ক্যামেরার সামনে দেখা যায়নি মোজতবাকে৷
হামলায় আহত হওয়া ও শোকের ছায়া: গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের ধারণা— ফেব্রুয়ারির সেই বিধ্বংসী বিমান হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন, যার কারণে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা রানিং রয়েছে৷ উল্লেখ্য— ওই একই হামলায় তাঁর বাবা ও ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং পরিবারের আরও চার সদস্য— তাঁর স্ত্রী, বোন, ভগ্নিপতি এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী এক নিষ্পাপ ভাতিজি নিহত হন৷ নিজের চোখের সামনে পুরো পরিবারকে হারানোর পর মোজতবার জীবন রক্ষা করা এখন তেহরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) কাছে সবচেয়ে বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
আড়ালে থেকেই চালাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ: দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকলেও ইরানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে মোজতবা খামেনির নামে একাধিক লিখিত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিবৃতি ও ডিক্রি প্রকাশ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে পর্দার আড়াল থেকেই তিনি রানিং ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন৷
গত ১৮ জুন প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় তিনি জানান— ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MoU) তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অনুমোদন করেছেন৷ তিনি দাবি করেন, ইরানের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া নিশ্ছিদ্র আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি এটি অনুমোদন দিয়েছেন, যা ইরানের জনগণের সার্বভৌম অধিকার রক্ষা করবে৷
পরবর্তীতে গত ২৮ জুন পাঠানো আরেকটি কঠোর বার্তায় মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচার দাবি করেন৷ একই সঙ্গে তিনি বলেন— “নিশ্চিতভাবে এই ভয়ংকর অপরাধীদের ধরে তাদের কৃতকর্মের জন্য কঠিন ও উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে৷”
শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের সংবেদনশীল সময়: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের এই চরম সংবেদনশীল ও ক্রান্তিকালে মোজতবা খামেনির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই দেশটির শাসন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি পাচ্ছে৷ বিশেষ করে চলমান যুদ্ধ-পরবর্তী ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে তাকে লক্ষ্য করে পশ্চিমা শক্তিগুলো নতুন কোনো হামলা চালাতে পারে বলে ইরানি নীতিনির্ধারক মহলে গভীর উদ্বেগ ও রানিং উত্তেজনা বাড়ছে৷ তবে সামরিক কৌশলগত কারণেই তাঁর অবস্থান, বাঙ্কার বা শারীরিক অবস্থা নিয়ে তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি৷
