বাহকরা জেলে যায়, আর মূল হোতারা যায় সংসদে

দেশে বিদ্যমান মাদকবিরোধী আইন যথেষ্ট কঠোর হওয়া সত্ত্বেও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালানের মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে এবং তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সংসদে পৌঁছাচ্ছে বলে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা৷ একই সুরে সুর মিলিয়ে সরকারি দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও টেকনাফের মাদক সিন্ডিকেটের নতুন হোতাদের চিহ্নিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি কড়া আহ্বান জানিয়েছেন৷ গত সোমবার (১৩ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের ২৩তম কার্যদিবসে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের জন্য উত্থাপনের পর বিলটির ওপর জনমত যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তাঁরা এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেন৷ এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল৷

টেকনাফ সীমান্ত ও বদের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানার জেরা: সংসদ অধিবেশনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রুমিন ফারহানা বলেন— ‘প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব মাদক মামলা সামনে আসে, সেখানে দেখা যায় বারবার স্রেফ ক্যারিয়ার বা চুনোপুঁটি বাহকরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়েন৷ কিন্তু সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির মতো যাদের নাম বিভিন্ন সরকারি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা দপ্তরের প্রতিবেদনে মাদক ব্যবসার শীর্ষ হোতা হিসেবে বারবার উঠে এসেছে, তারা বহাল তবিয়তে সংসদে যান৷ আর তারা সরাসরি কোনো কারণে যেতে না পারলে, তাদের পরিবারের সদস্যরা সুকৌশলে সংসদে যান৷’

তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে সাফ জানিয়ে দেন— ‘যতদিন পর্যন্ত আমরা সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং যাদের হাত দিয়ে ও ছত্রছায়ায় টেকনাফ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে কোটি কোটি টাকার মাদক প্রবেশ করে, সেই গডফাদার বা মূল হোতাদের ধরতে না পারব, ততদিন কোনো নতুন আইন পাস করে এই মরণব্যাধি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না৷’

আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই সাংসদ বলেন— ‘আমাদের বিদ্যমান আইন কিন্তু ইতিমধ্যেই যথেষ্ট কঠোর৷ মাত্র ২৫ গ্রাম বা তার বেশি ওজনের মাদক উদ্ধার হলেই আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে৷ কিন্তু এরপরও লাখ লাখ পিস ইয়াবা কিংবা কয়েক কেজি হেরোইনসহ মাদকের বড় বড় চালান বহনকারী চুনোপুঁটিরা গ্রেপ্তার হলেও পুলিশি তদন্তের হাত কোনোদিনই নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের কলার পর্যন্ত পৌঁছায় না৷’

‘বদি তো বধ হয়েছে, এখন ওখানকার দায়িত্ব কে নিছে?’— গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: এর আগে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৬তম কার্যদিবসে গত ২৭ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল বিএনপির সিনিয়র সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও একই মাদক সিন্ডিকেট প্রসঙ্গ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন৷

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অত্যন্ত রসাত্মক ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেছিলেন— ‘আগে শুনতাম টেকনাফে মাদক সম্রাট বদি আছে, এখন তো বদি নাই, বদি তো বধ হয়ে গেছে৷ কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো— এখন ওইখানকার টেকনাফ সীমান্তের দায়িত্বটা নতুন করে কে নিছে? বাড়ির আশেপাশের লোক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তো তাদের খুব ভালো করেই চেনার কথা৷ এতদিন ওইদিক দিয়ে মাদক আসা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া উচিত ছিল৷’

তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে আরও বলেন— ‘শুধু সাদা কাগজে আইন পাস করে কোনো দিন কোনো সমাজ সংস্কার করা যায় না৷ আইন সত্যিকার অর্থে মাঠপর্যায়ে কার্যকর করার জন্য সৎ সাহস ও রাজনৈতিক ইচ্ছা লাগে৷ সুতরাং বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশে মাদকাসক্তি ও মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণ নির্মূল করা৷’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *