আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্যে এক ঐতিহাসিক বড় ধরনের ধস নেমেছে৷ বিশ্ববাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কমে গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে৷ বুধবার (২৪ জুন) আন্তর্জাতিক লেনদেনে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম একধাক্কায় ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে যায়, যা বিগত ২০২৫ সালের নভেম্বরের পর এই প্রথম৷ তুরস্কের খ্যাতনামা সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে৷
এক দিনেই দাম কমল ৩.৩ শতাংশ: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— আন্তর্জাতিক বাজারে বুধবার দিনের ব্যবধানে স্বর্ণের দাম একমুহূর্তে ৩.৩ শতাংশ কমে যায়৷ এতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম প্রায় ৩ হাজার ৯৭৪ দশমিক ৬০ ডলারে নেমে আসে৷ এর ফলে মূল্যবান ধাতুটির বৈশ্বিক বাজারমূল্য গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে গিয়ে পৌঁছায়, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বড় চাপের মুখে ফেলেছে৷
স্বর্ণের দাম কমার প্রধান কারণসমূহ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কঠোর মুদ্রানীতির জোরালো সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে কমে আসায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদা অনেক হ্রাস পেয়েছে৷ এর বাইরে আরও কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণে স্বর্ণের বাজারে এই তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে:
১. মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কড়া অবস্থান: মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেড) সর্বশেষ নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলেও ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার আরও বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে৷ ফেডের নতুন চেয়ারম্যান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকের কঠোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন৷ সাধারণত সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা স্বর্ণের জন্য নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ স্বর্ণালঙ্কার বা কাঁচা স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ বা নিয়মিত লভ্যাংশ পাওয়া যায় না৷
২. যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তি: বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে৷ দুই দেশের এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমেছে৷ এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে ঝুঁকি কমায় নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বড় ব্যবসায়ীরা৷
৩. প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে পতন: সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস বা পতন দেখা দেওয়ায় অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছেন৷ শেয়ারবাজারের সেই বিশাল ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নিতে তাঁরা নিজেদের কাছে থাকা স্বর্ণ গণহারে বিক্রি করা শুরু করেছেন, যা বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্যপতনকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করেছে৷
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন— মার্কিন সুদের হার নিয়ে বাজারের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা এবং চলমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আগামী দিনগুলোতেও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের এই ওঠানামা বা অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে৷
