লাখো হাজির কান্নাভেজা দোয়ায় মুখরিত আরাফাতের ময়দান, পালিত হচ্ছে হজের মূল রুকন

পবিত্র হজের সবচেয়ে পবিত্র, তাৎপর্যপূর্ণ ও সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক পর্ব পালন করতে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ১৬ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ হজযাত্রী। জিলহজ মাসের নবম দিনের (৯ জিলহজ) ভোর থেকেই শুভ্র সাদা ইহরাম পরিহিত হাজিরা লাব্বাইক ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত করে আরাফাতের ময়দানে প্রবেশ করতে শুরু করেন।

ইসলামী ঐতিহ্য ও শরিয়ত অনুযায়ী, আরাফাতে অবস্থান বা ‘উকুফে আরাফা’ হজের প্রধান ফরজ ও মূল রুকন হিসেবে বিবেচিত। এখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে ইবাদত-বন্দেগি, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, জিকির এবং বিশেষ প্রার্থনায় দিনটি অতিবাহিত করছেন হাজিরা।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, আরাফার দিনটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য বছরের সবচেয়ে পবিত্র দিনগুলোর একটি। এটি মূলত মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা, রহমত অর্জন ও আত্মশুদ্ধির এক মহাসম্মেলন। দিনভর হাজিদের অবিরাম তালবিয়া, তাকবির ও দুই চোখ বেয়ে পড়া কান্নাভেজা তাওবার দোয়ায় মুখর হয়ে উঠেছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত আরাফাতের প্রান্তর। হাজিদের একটি বড় অংশ মক্কার ঐতিহাসিক ‘জাবালে রহমত’ বা রহমতের পাহাড়ের পাদদেশে এবং এর আশেপাশে অবস্থান নিয়ে ইবাদতে মশগুল রয়েছেন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানেই আদি পিতা হযরত আদম (আ.) ও মাতা হাওয়া (আ.) দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর পুনর্মিলিত হয়েছিলেন।

ইতিহাস অনুযায়ী, এই আরাফাতের ময়দানেই আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে (৬shortcut খ্রিস্টাব্দে) মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের ঐতিহাসিক বিদায়ী ভাষণ প্রদান করেছিলেন। সেই ভাষণে তিনি ইসলাম ও মানবতার সার্বজনীন রূপরেখা— ন্যায়বিচার, সাম্য এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের মর্যাদা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। আজ দুপুরে মসজিদে নামিরাহ থেকে হাজিদের উদ্দেশে আরাফার বিশেষ খুতবা প্রদান করা হয়। খুতবা শেষে সুন্নাহ অনুযায়ী হাজিরা জোহর ও আসরের নামাজ একই সাথে এবং সংক্ষিপ্ত আকারে (কসর) আদায় করেন।

চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরমের কারণে আরাফাতের ময়দানে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সৌদি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ হাজিদের পর্যাপ্ত পানি পান ও সরাসরি রোদ এড়িয়ে ছাতা ব্যবহারের বিশেষ পরামর্শ দিয়েছে। হজযাত্রীদের নিরাপত্তা, যাতায়াত ও অবস্থান নির্বিঘ্ন করতে সৌদি সরকার এবার ব্যাপক রোবোটিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা, এয়ার কুলিং সিস্টেম ও জরুরি সহায়তার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত রয়েছে হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী।

আরাফাতের ময়দানে পবিত্র দিনটি অতিবাহিত করার পর সূর্যাস্তের সাথে সাথেই হাজিরা কোনো বিরতি না দিয়ে মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হতে শুরু করেছেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তারা মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে এবং কসর আকারে আদায় করে খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত প্রান্তরে রাতযাপন করবেন। একই সাথে শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের জন্য সেখান থেকে ছোট ছোট কঙ্কর বা পাথর সংগ্রহ করবেন হাজিরা। আগামীকাল ১০ জিলহজ সকালে তারা পুনরায় মিনায় ফিরে গিয়ে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটার মাধ্যমে হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।

সূত্র: আরব নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *