সুনামগঞ্জের ছাতকে সিনিয়র সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির ওপর হামলার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আয়োজিত শালিশ বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে। বৈঠকে হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে অভিযুক্তরা সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বক্তব্য ও অভিযোগ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

শালিশ বৈঠকে যাচাই-বাছাই ও আলোচনার পর সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান। তবে বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার ও নতুন মিটার স্থাপনকে কেন্দ্র করে এলাকায় অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ এবং তা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের বিষয়টি আরও স্বচ্ছভাবে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলেও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মত দেওয়া হয়।

গত রোববার বিকেলে উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের বুড়াইরগাঁও ভূমি অফিসের সামনে এ শালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম, সাবেক চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন, মখলিছুর রহমান, উপজেলা বিএনপি নেতা আশরাফুর রহমান এনাম, বিএনপি নেতা আমিন উদ্দিন, উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহিম আলী রাসেল, উপজেলা বিএনপি নেতা এমাদ উদ্দিন এমাদ, যুবদল নেতা আব্দুস সাত্তার ও মনির উদ্দিন, কৃষকদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন, ব্যবসায়ী শিমুল আহমদ আবু, আবুল কালাম, ইউপি সদস্য সাদ উদ্দিন, সাজল মেম্বার, সোনাফর আলী, নুর আলী, সারব আলী, আব্দুস ছোবহান, লিলু মিয়া, সাইফ উদ্দিন, নাসির উদ্দিন ও আলীম উদ্দিনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

শালিশে বক্তারা সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, মতপার্থক্য বা কোনো বিষয়ে ভুল-বোঝাবুঝি হলে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা উচিত। কোনো সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, ভয়ভীতি বা বাধার শিকার হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

পরে হামলার ঘটনায় অভিযুক্তরা সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির কাছে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা
হামলার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। এসব পোস্টে তাকে চাঁদাবাজ হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগও ওঠে। শালিশ বৈঠকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব বক্তব্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিরা বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তা যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে চাঁদাবাজ বা অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করলে তার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শালিশে আলোচনার পর সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান। বক্তারা আরও বলেন, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে যাতে নির্বিঘ্নে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে পারেন, সে পরিবেশ বজায় রাখা স্থানীয় সমাজের সবার দায়িত্ব।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলার উত্তর খুরমা ইউনিয়নের আলমপুর-মাজিহারা এলাকায় বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়া এবং নতুন বিদ্যুৎ মিটার স্থাপনকে কেন্দ্র করে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়।

গত ২৬ জুলাই আলমপুর এলাকার ২০০ কেভিএ ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যায়। এতে পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ছাতক পিডিবি অফিস থেকে একটি ট্রান্সফরমার আনার উদ্যোগ নেন। এ সময় গ্রামবাসীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি এলাকায় আলোচনায় আসে।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ ছিল, ট্রান্সফরমার আনা ও স্থাপনের নামে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা সংগ্রহ বা লেনদেনের আলোচনা হয়েছিল বলেও স্থানীয়ভাবে অভিযোগ ওঠে।

তবে এসব অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, কী উদ্দেশ্যে অর্থ নেওয়া হয়েছিল এবং অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত—এসব বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

অন্যদিকে সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি স্থানীয় গ্রামবাসীকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ট্রান্সফরমার স্থাপনের সুযোগ রয়েছে এবং এ জন্য অপ্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় না করার বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়রা জানান।

এ বিষয়কে কেন্দ্র করেই পরে গোবিন্দগঞ্জ কলেজসংলগ্ন একটি দোকানের ভেতরে সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়।
হামলায় কয়েকজন আহত

সাংবাদিক রনির ওপর হামলার সময় তাকে রক্ষা করতে গিয়ে ব্যবসায়ী ও যুবদল নেতা আব্দুস সাত্তার, ব্যবসায়ী রাকিব আলী, ব্যবসায়ী নগর করিম, আব্দুর রহমান, হারিছ আলী, মনির উদ্দিন, দুধু মিয়া, আক্তার হোসেনসহ কয়েকজন আহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে আহতদের কৈতক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন স্থানীয় সূত্র জানায়, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ার দুই দিনের মধ্যে, গত ২৮ জুলাই রাতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নতুন ২০০ কেভিএ ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হয়। এরপর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। এদিকে নতুন বিদ্যুৎ মিটার স্থাপনের ক্ষেত্রেও প্রতি মিটারে এক হাজার টাকা করে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়েও এলাকায় আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তবে এ অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গে‌ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিদ্যুৎ সংযোগ, ট্রান্সফরমার পরিবর্তন ও নতুন মিটার স্থাপন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করা জরুরি। এ জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও গ্রামবাসীদের নিয়ে উন্মুক্ত বৈঠক আয়োজন করা যেতে পারে।

এ ধরনের বৈঠকে সরকারি সেবার প্রকৃত নিয়ম, প্রয়োজনীয় খরচ এবং কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন—এসব বিষয় স্পষ্ট করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি কমবে বলে মনে করছেন তারা। পুরোনো অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও আলোচনায় স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, আলমপুর, গন্ধর্বপুর ও ভরাংপাড়া এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের সময়ও বিভিন্ন সময়ে অর্থ সংগ্রহ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

তাদের দাবি, ২০১২ সালে ওই এলাকায় ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইন ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে গ্রামবাসীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছিল। তবে এসব পুরোনো অভিযোগেরও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

স্থানীয়দের মতে, অতীতের কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমান কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করা উচিত নয়। একইভাবে বর্তমান কোনো অভিযোগও যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে প্রচার করা উচিত নয়।

সাংবাদিক রনির বক্তব্য সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি বলেন, “সাহসী সাংবাদিকতাকে হামলা-মামলা দিয়ে থামিয়ে রাখা যায় না। সত্য কখনো চাপা পড়ে থাকে না; সত্যের শেষ পর্যন্ত জয় হয়।” তিনি বলেন, আলমপুর-মাজিহারা গ্রামের সাধারণ মানুষের নাম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায় গ্রামবাসীর

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *