.
নটরাজ এন এ পলাশ’র
“”বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্ব””
নবরসকে অস্বীকার নয়, নবরসকে ভিত্তি করে যাত্রার অদৃশ্য রসপরিসরের অনুসন্ধান
নটরাজ এন এ পলাশ
অনেকদিন ধরে একটি প্রশ্ন আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে- যাত্রাশিল্পের নান্দনিক অভিজ্ঞতাকে কি কেবল ভারতীয় শাস্ত্রীয় নবরসের কাঠামোর মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব..?
নবরস নিঃসন্দেহে ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের এক শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক রসব্যবস্থা। শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত ও শান্ত- এই নয়টি রস মানুষের বহুমাত্রিক আবেগ ও নান্দনিক অভিজ্ঞতার বিশাল একটি ক্ষেত্রকে ধারণ করে। কিন্তু বাংলা যাত্রাশিল্পের দীর্ঘ লোকঐতিহ্য, জনজীবন, সম্পর্ক, সামাজিক অভিজ্ঞতা, আত্মত্যাগ, স্বদেশচেতনা এবং আত্মজাগরণের মতো বিশেষ কিছু নান্দনিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করতে গেলে আরও বিস্তৃত একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
এই ভাবনা থেকেই আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, পাঠ, যাত্রাপালার বিষয়বস্তু, অভিনয়রীতি, গান, বাচন, বাদ্য, লোকজ জীবন এবং দর্শক- অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তার ধারাবাহিকতায় একটি প্রস্তাবিত নন্দনতাত্ত্বিক মডেলের জন্ম হয়েছে- “”বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্ব””।
এটি কোনোভাবেই নবরসের বিরোধিতা নয়। বরং এর মূল বক্তব্য হলো-
“নবরসকে অস্বীকার নয়, নবরসকে ভিত্তি করে যাত্রার অদৃশ্য রসপরিসরের অনুসন্ধান।”
‘বঙ্গরসায়ন’ শব্দের তাত্ত্বিক তাৎপর্য
‘বঙ্গরসায়ন’ শব্দটিকে তিনটি ধারণায় বিশ্লেষণ করা যায়-
বঙ্গ + রস + আয়ন
এখানে ‘বঙ্গ’ বলতে বোঝানো হচ্ছে বাংলা ভূখণ্ডের জীবন, লোকঐতিহ্য, জনমানস, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা।
‘রস’ অর্থ নান্দনিক অনুভব।
আর ‘আয়ন’ বলতে বোঝানো হচ্ছে বিশ্লেষণ, প্রবাহ ও উপলব্ধির পথ।
সুতরাং, বঙ্গরসায়ন বলতে বোঝানো হচ্ছে- বাংলার জীবন ও যাত্রাশিল্পে প্রকাশিত নান্দনিক অনুভূতির উৎপত্তি, গতি, রূপান্তর এবং দর্শক- অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণের একটি প্রস্তাবিত রসতাত্ত্বিক পদ্ধতি।
রসের একটি প্রস্তাবিত নতুন সংজ্ঞা:
বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্বে রসকে কেবল ‘অনুভূতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে-
“শিল্পের বিভাব, অভিনয়, বাচন, সংগীত, দেহভঙ্গি, দৃশ্য, গতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের সমন্বয়ে যে স্বতন্ত্র নান্দনিক অনুভব দর্শকের চৈতন্যে আস্বাদিত হয়, তাকে রস বলা যায়।”
অর্থাৎ ভাব ও রস এক নয়।
ভাব হচ্ছে রস- সৃষ্টির উপাদান, ভাবের নান্দনিক রূপান্তর ও দর্শকের আস্বাদিত অভিজ্ঞতাই রসের পরিণত রূপ।
এই পার্থক্যটি বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্বের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।
যাত্রার রস- সমীকরণ
বঙ্গরসায়নে যাত্রার রস-উৎপত্তিকে একটি কার্যকর ধারায় দেখা যায়-
বিভাব, অনুভূতির উদ্ভব, অভিনয় ও শিল্পমাধ্যমে প্রকাশ, রসগতি, রসোদ্ভব, রসাস্বাদ, চৈতন্যপ্রতিক্রিয়া
যাত্রাশিল্পের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ যাত্রায় বাচন, গান, বাদ্য, দেহাভিনয়, লোকভাষা, মঞ্চীয় গতি এবং দর্শকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ- সবকিছু মিলিতভাবে নান্দনিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করতে পারে।
এই সমন্বিত প্রকৃতিই যাত্রার রস- অভিজ্ঞতাকে অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের তুলনায় একটি স্বতন্ত্র বিশ্লেষণাত্মক ক্ষেত্র প্রদান করে।
অষ্টাদশ রসের প্রস্তাবিত স্থাপত্য:
বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্বে ১৮টি রসকে তিনটি বৃহৎ রস- মণ্ডলে বিন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
প্রথম মণ্ডল : আদি মানবীয় রস-
১. শৃঙ্গার
২. হাস্য
৩. করুণ
৪. রৌদ্র
৫. বীর
৬. ভয়ানক
৭. বীভৎস
৮. অদ্ভুত
৯. শান্ত
এগুলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় নবরসের ভিত্তিমণ্ডল।
দ্বিতীয় মণ্ডল : সম্পর্ক ও সামাজিক চেতনার রস-
১০. ভক্তি
১১. বাৎসল্য
১২. সখ্য
১৩. বিরহ
১৪. ত্যাগ
১৫. প্রতিবাদ
১৬. দেশপ্রেম
এগুলো যাত্রার সম্পর্কীয়, সামাজিক ও মূল্যবোধভিত্তিক অভিজ্ঞতার সম্প্রসারিত বিশ্লেষণী শ্রেণি।
তৃতীয় মণ্ডল : জনজীবন ও চৈতন্যের রস-
১৭. লোকজ
১৮. চৈতন্য
এখানে লোকজ মানুষের জীবন ও জনসমাজের প্রাণস্পন্দনকে এবং চৈতন্য সেই অভিজ্ঞতার আত্মিক ও মানবিক উপলব্ধির পরিণতিকে নির্দেশ করে।
প্রতিটি রসের দশটি বিশ্লেষণাত্মক মানদণ্ড
বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্বে কোনো রসকে শুধু নাম দিয়ে গ্রহণ করা হবে না। প্রতিটি রসকে অন্তত দশটি মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে-
১. রসের নাম
২. মূল অনুভূতি
৩. স্থায়ীভাব বা কেন্দ্রীয় আবেগ
৪. বিভাব
৫. অনুভাব
৬. সঞ্চারী বা সহায়ক অনুভূতি
৭. রসগতি
৮. যাত্রাভিনয়ে প্রকাশ
৯. গান, বাদ্য ও মঞ্চের ভূমিকা
১০. দর্শকের চূড়ান্ত নান্দনিক প্রতিক্রিয়া
এর ফলে অষ্টাদশ রস কেবল একটি তালিকা হয়ে থাকবে না, বরং একটি তুলনামূলক নন্দনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ- পদ্ধতিতে পরিণত হবে।
রসগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও রসগতি:
১. শৃঙ্গার রস:-
কেন্দ্র: প্রেম ও আকর্ষণ।
রসগতি:
আকর্ষণ, পরিচয়, অনুরাগ, আকাঙ্ক্ষা, মিলন/বিরহ, পরিণতি।
যাত্রায়: গান, দৃষ্টি, সংলাপ, দেহভঙ্গি, সুর এবং বিরহের দৃশ্য শৃঙ্গার রসের গুরুত্বপূর্ণ বাহন হতে পারে।
দর্শক- প্রতিক্রিয়া: প্রেমের নান্দনিক আস্বাদ।
২. হাস্য রস:-
কেন্দ্র: কৌতুক।
রসগতি:
অসংগতি, কৌতুক, হাসি, মানসিক মুক্তি।
যাত্রায় হাস্যরসের একটি অতিরিক্ত কার্যকর ভূমিকা থাকতে পারে- রসান্তর। অর্থাৎ তীব্র বা ভারী আবেগের পর দর্শককে সাময়িকভাবে মানসিক মুক্তি দিয়ে পরবর্তী রস গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা।
৩. করুণ রস:-
কেন্দ্র: বেদনা।
রসগতি:
ক্ষতি, অসহায়ত্ব, বেদনা, কান্না, সহমর্মিতা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো- করুণ রসের সর্বোচ্চ বিন্দু কেবল কান্না নয়, বরং সহমর্মিতা।
৪. রৌদ্র রস:-
কেন্দ্র: ক্রোধ।
রসগতি:
অন্যায়, ক্ষোভ, ক্রোধ, বিস্ফোরণ, প্রতিরোধ।
রৌদ্রের নান্দনিক শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবেগীয় উত্তাপ সৃষ্টি করা।
৫. বীর রস:-
কেন্দ্র: সাহস।
রসগতি:
সংকট, সিদ্ধান্ত, সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, বিজয়/আত্মত্যাগ।
বীর রস দর্শকের মধ্যে সাহস, দৃঢ়তা ও সংগ্রামী চেতনার নান্দনিক অনুভব সৃষ্টি করতে পারে।
৬. ভয়ানক রস:-
কেন্দ্র: আতঙ্ক।
রসগতি:
অজানা, আশঙ্কা, উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক, অস্তিত্বের সংকট।
যাত্রায়: শব্দ, নীরবতা, আলো, অন্ধকার, বিরতি ও আকস্মিক দৃশ্যান্তর এই রসের শক্তিশালী বাহন হতে পারে।
৭. বীভৎস রস:-
কেন্দ্র: বিকর্ষণ।
রসগতি:
অমানবিকতা, বিকর্ষণ, ঘৃণা, নৈতিক প্রত্যাখ্যান।
বীভৎস কেবল শারীরিক ঘৃণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নৈতিক অধঃপতনও এর বিষয় হতে পারে।
৮. অদ্ভুত রস:-
কেন্দ্র: বিস্ময়।
রসগতি:
অজানা, কৌতূহল, বিস্ময়, আবিষ্কার, মুগ্ধতা।
লোককথা, পৌরাণিকতা, অলৌকিকতা ও কল্পনাময় দৃশ্য অদ্ভুত রসের শক্তিশালী ক্ষেত্র।
৯. শান্ত রস:-
কেন্দ্র: প্রশান্তি।
রসগতি:
সংঘাত, উপলব্ধি, গ্রহণ, আত্মসংযম, প্রশান্তি।
অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সংঘাত ও মানসিক উত্তরণের পর শান্ত রস পরিণত নান্দনিক অভিজ্ঞতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
সম্প্রসারিত নয়টি রস:=
১০. ভক্তি রস:-
কেন্দ্র: শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণ।
রসগতি:
বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, আকর্ষণ, আত্মসমর্পণ, আধ্যাত্মিক অনুভব।
এখানে ভক্তিকে প্রাচীন নবরসের সমমর্যাদার ঐতিহাসিক শ্রেণি হিসেবে ঘোষণা না করে বঙ্গরসায়নের সম্প্রসারিত বিশ্লেষণী শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করাই অধিক সংযত একাডেমিক অবস্থান।
১১. বাৎসল্য রস:-
কেন্দ্র: মমতা।
রসগতি:
স্নেহ, সুরক্ষা, মমতা, বিচ্ছেদভয়, আত্মবিসর্জন।
এর কেন্দ্রীয় নীতি হতে পারে- “নিজের চেয়ে অন্যের অস্তিত্বকে বড় করে দেখা।”
১২. সখ্য রস:-
কেন্দ্র: বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক আস্থা।
রসগতি:
পরিচয়, বিশ্বাস, বন্ধন, সহায়তা, আত্মীয়তা।
এর চূড়ান্ত দর্শক- অনুভব হতে পারে- “আমি একা নই।”
১৩. বিরহ রস:-
বিরহ বঙ্গরসায়ন তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ।
কেন্দ্র: বিচ্ছেদ।
রসগতি:
বিচ্ছেদ, শূন্যতা, স্মৃতি, অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা, অন্তর্দৃষ্টি। বিরহকে শৃঙ্গারের উপপ্রকার হিসেবে না দেখে স্বতন্ত্র রস হিসেবে প্রস্তাব করতে হলে তার স্বতন্ত্র বিভাব, অনুভাব, রসগতি এবং দর্শক- আস্বাদকে গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
১৪. ত্যাগ রস:-
কেন্দ্র: আত্মবিসর্জন।
রসগতি:
সংকট, আত্মসংঘাত, সিদ্ধান্ত, বিসর্জন, মহত্ত্ব।
এর চূড়ান্ত নান্দনিক অনুভব- আত্মবিসর্জনের মহিমা।
১৫. প্রতিবাদ রস:-
কেন্দ্র: অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগরণ।
রসগতি:
অন্যায়, সচেতনতা, প্রশ্ন, ক্ষোভ, প্রতিবাদ, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
এখানে রৌদ্র ও প্রতিবাদের পার্থক্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
রৌদ্রের কেন্দ্র ক্রোধ, প্রতিবাদের কেন্দ্র পরিবর্তনের চেতনা।
১৬. দেশপ্রেম রস:-
কেন্দ্র: স্বদেশচেতনা।
রসগতি:
ভূমি, পরিচয়, স্মৃতি, ভালোবাসা, দায়বোধ, আত্মত্যাগ।
দেশপ্রেম এখানে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। বরং—
মাটি + মানুষ + ভাষা + ইতিহাস + সংস্কৃতি + স্মৃতি = স্বদেশচেতনা।
১৭. লোকজ রস:-
যাত্রাশিল্পের স্বাতন্ত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে লোকজ রস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব।
কেন্দ্র: জনজীবনের প্রাণস্পন্দন।
রসগতি:
মাটি, শ্রম, জীবন, সম্পর্ক, উৎসব, দুঃখ, হাসি, সামষ্টিকতা।
লোকজ মানে কেবল গ্রামীণ নয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, শ্রম, সম্পর্ক, উৎসব, বেদনা, হাসি ও সামষ্টিক অস্তিত্বের যে নান্দনিক প্রাণস্পন্দন- তাই লোকজ রসের কেন্দ্রে।
১৮. চৈতন্য রস:-
অষ্টাদশ রসের দার্শনিক শিখর হিসেবে চৈতন্য রসকে প্রস্তাব করা যেতে পারে।
কেন্দ্র: আত্মজাগরণ।
রসগতি:
অভিজ্ঞতা, প্রশ্ন, আত্মঅনুসন্ধান, উপলব্ধি, জাগরণ, মানবিক উত্তরণ।
একটি যাত্রাপালা শেষ হওয়ার পর যদি দর্শক নিজের জীবন, সমাজ, মানুষ অথবা অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন কোনো প্রশ্ন নিয়ে ফিরে যান, তবে সেখানে চৈতন্য রসের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
‘রসগতি’- বঙ্গরসায়নের মৌলিক ধারণা
বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবিত ধারণা হলো ‘রসগতি’।
প্রচলিতভাবে রস বিশ্লেষণে প্রশ্ন করা হয়- “কী অনুভূতি..?”
বঙ্গরসায়ন আরও একটি প্রশ্ন যোগ করতে চায়-
“রসটি কীভাবে জন্ম নেয়, কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং কোথায় গিয়ে পূর্ণতা পায়..?”
এই প্রবাহই রসগতি।
উদাহরণ-
করুণ:-
ক্ষতি, বেদনা, কান্না, সহমর্মিতা
রৌদ্র:-
অন্যায়, ক্ষোভ, ক্রোধ, প্রতিরোধ
প্রতিবাদ:-
অন্যায়, সচেতনতা, প্রশ্ন, প্রতিবাদ, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা
চৈতন্য:-
অভিজ্ঞতা, প্রশ্ন, অনুসন্ধান, উপলব্ধি, জাগরণ।
অতএব, প্রতিটি মৌলিক রসের একটি নিজস্ব গতিপথ থাকা প্রয়োজন।
রসের ‘পরিচয়- পরীক্ষা’
বঙ্গরসায়ন কোনো অনুভূতিকে কেবল নাম দেওয়ার মাধ্যমে স্বতন্ত্র রস হিসেবে গ্রহণ করতে চায় না।
কোনো নতুন রসকে গ্রহণযোগ্য করতে অন্তত সাতটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে-
প্রথমত:- স্বতন্ত্র স্থায়ী অনুভূতি:
এর নিজস্ব কেন্দ্রীয় অনুভূতি আছে কি..?
দ্বিতীয়ত:- স্বতন্ত্র বিভাব:
এর জন্মের কারণ অন্য রস থেকে যথেষ্ট পৃথক কি..?
তৃতীয়ত:- স্বতন্ত্র অনুভাব:
এর বাহ্যিক প্রকাশ আলাদা কি..?
চতুর্থত:- স্বতন্ত্র রসগতি:
জন্ম থেকে পরিণতি পর্যন্ত এর নিজস্ব প্রবাহ আছে কি..?
পঞ্চমত:- স্বতন্ত্র নান্দনিক আস্বাদ:
দর্শক এখানে মৌলিকভাবে ভিন্ন কোনো নান্দনিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন কি..?
ষষ্ঠত:- স্বতন্ত্র যাত্রা- প্রকাশ:
বাচন, গান, দেহাভিনয়, বাদ্য ও মঞ্চে এটি স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশযোগ্য কি..?
সপ্তমত:- অবিভাজ্যতা:
প্রস্তাবিত রসটি ইতিমধ্যে বিদ্যমান কোনো রসের গভীর রূপ, উপপ্রকাশ বা সংমিশ্রণ মাত্র কি না- তা প্রমাণ করতে হবে।
এই পরীক্ষাগুলো উত্তীর্ণ না হলে কোনো অনুভূতিকে নতুন রস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।
তাহলে কি ভবিষ্যতে ‘উনিশতম রস’ হতে পারে..?
বঙ্গরসায়ন এই সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে না।
বরং তার অবস্থান হবে-
“প্রমাণ করুন।”
ভবিষ্যতে কেউ উনিশতম কোনো রসের প্রস্তাব করলে তাকে দেখাতে হবে-
স্বতন্ত্র স্থায়ী অনুভূতি, স্বতন্ত্র বিভাব, স্বতন্ত্র অনুভাব, স্বতন্ত্র রসগতি, স্বতন্ত্র দর্শক- আস্বাদ, বিদ্যমান ১৮টি রসের সঙ্গে মৌলিক অমিল এবং স্বতন্ত্র যাত্রাভাষা।
অর্থাৎ বঙ্গরসায়ন কোনো বন্ধ তত্ত্ব নয়, এটি একটি পরীক্ষাযোগ্য ও সংশোধনযোগ্য নন্দনতাত্ত্বিক কাঠামো।
এই অবস্থানই তত্ত্বটিকে আরও শক্তিশালী ও গবেষণাযোগ্য করে তোলে।
রস ও রস- সংমিশ্রণ
অষ্টাদশ রস মানে অষ্টাদশটি বিচ্ছিন্ন অনুভূতি- এমন নয়।
রস পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া ও সংমিশ্রণ ঘটাতে পারে।
যেমন:-
শৃঙ্গার + বিরহ = বিরহময় প্রেম। করুণ + ত্যাগ = আত্মবিসর্জনের বেদনা। রৌদ্র + প্রতিবাদ = সামাজিক প্রতিরোধ। বীর + দেশপ্রেম = স্বদেশের জন্য সংগ্রাম। ভক্তি + চৈতন্য = আধ্যাত্মিক জাগরণ। লোকজ + হাস্য = জনজীবনের কৌতুক। অতএব:
“মৌলিক রসের সংখ্যা নির্দিষ্ট হতে পারে, কিন্তু রসের পারস্পরিক সংমিশ্রণ ও প্রকাশের সম্ভাবনা অসীম।”
রসের কার্যকর স্তরবিন্যাস বিশ্লেষণের সুবিধার্থে অষ্টাদশ রসকে আরও চারটি কার্যকর স্তরে দেখা যেতে পারে।
অনুভব:
শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত।
কর্ম:
বীর, ত্যাগ, প্রতিবাদ।
সম্পর্ক:
ভক্তি, বাৎসল্য, সখ্য, বিরহ।
চেতনা:
শান্ত, দেশপ্রেম, লোকজ, চৈতন্য।
এই স্তরবিন্যাস মূল অষ্টাদশ রসের বিকল্প নয়, বরং রসের কার্যকারিতা ও আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণের একটি সহায়ক পদ্ধতি।
যাত্রার ‘রসচক্র’ একটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রাপালার রস-অভিজ্ঞতা একটি রস থেকে অন্য রসে প্রবাহিত হতে পারে।
লোকজ জীবন শৃঙ্গার,বিরহ,করুণ,রৌদ্র,প্রতিবাদ,বীর,ত্যাগ,দেশপ্রেম,ভক্তি,শান্ত,চৈতন্য
এটি কোনো বাধ্যতামূলক সূত্র নয়। বরং যাত্রাপালার সম্ভাব্য রসগত গতিপথের একটি মডেল।
এখানেই বঙ্গরসায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে আসে-
যাত্রা শুধু দর্শককে অনুভব করায় না, যাত্রা দর্শকের চেতনায় পরিবর্তনের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করতে পারে।
‘যাত্রার পূর্ণতা’ বলতে কী বোঝাবে..?
অষ্টাদশ রসের তত্ত্ব প্রস্তাব করার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি যাত্রাপালায় ১৮টি রসই থাকতে হবে।
বরং একটি যাত্রাপালার কাহিনি, চরিত্র, সংঘাত, পরিবেশ ও শিল্প-উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রসসমূহের স্বাভাবিক, সুষম ও নান্দনিক বিকাশ ঘটলেই সেই পালা রসগতভাবে পরিপূর্ণ হতে পারে।
অতএব:
একটি পালা ≠ অষ্টাদশ রসের বাধ্যতামূলক সমাবেশ।
কিন্তু-
যাত্রার সামগ্রিক রসতত্ত্ব = অষ্টাদশ রসের বিস্তৃত বিশ্লেষণাত্মক পরিসর।
এই পার্থক্যটি বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক সংশোধন।
গবেষণার সম্ভাব্য পদ্ধতি
এই তত্ত্বকে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী করতে তিনটি প্রধান গবেষণাপদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
পাঠ-গবেষণা:
প্রাচীন, মধ্যবর্তী ও আধুনিক যাত্রাপালার পাঠ বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন রসের উপস্থিতি, ব্যবহার ও রসগতি নির্ণয়।
পারফরম্যান্স-গবেষণা:
মঞ্চে অভিনেতার বাচন, দেহাভিনয়, গান, বাদ্য, গতি, মঞ্চব্যবস্থা ও দর্শকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ।
দর্শক-গবেষণা:
দর্শক কোনো দৃশ্য, গান, চরিত্র বা অভিনয়কে কীভাবে অনুভব করেন তা সাক্ষাৎকার, প্রশ্নপত্র, পর্যবেক্ষণ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা।
এই গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অষ্টাদশ রসের প্রতিটির স্বাতন্ত্র্য আরও সুস্পষ্টভাবে যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণার মূল অনুমান
প্রথম অনুমান:
নবরস যাত্রাশিল্পের বহু মৌলিক অনুভূতি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম।
দ্বিতীয় অনুমান:
যাত্রার সব স্বতন্ত্র জীবন-অভিজ্ঞতা নবরসের মধ্যে একই বিশ্লেষণাত্মক স্বচ্ছতায় ধরা নাও পড়তে পারে।
তৃতীয় অনুমান:
ভক্তি, বাৎসল্য, সখ্য, বিরহ, ত্যাগ, প্রতিবাদ, দেশপ্রেম, লোকজ ও চৈতন্য- এই অভিজ্ঞতাগুলো যদি স্বতন্ত্র রসগতি ও নান্দনিক আস্বাদ প্রদর্শন করতে পারে, তবে সেগুলোকে যাত্রার সম্প্রসারিত রসশ্রেণি হিসেবে মডেল করা যুক্তিসঙ্গত হতে পারে।
চতুর্থ অনুমান:
রসের স্বাতন্ত্র্য নির্ধারণে শুধু নাম নয়, স্থায়ী অনুভূতি, বিভাব, অনুভাব, রসগতি এবং দর্শক-আস্বাদ- সবগুলোকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বঙ্গরসায়নের পাঁচটি মৌলিক সূত্র
সূত্র–১
ভাব- রস নয়, ভাবের নান্দনিক পরিণতিই রস।
সূত্র–২
রসের জন্ম- বিভাবে, প্রকাশ- অভিনয়ে, বিস্তার- সংগীতে এবং পূর্ণতা- রসাস্বাদে।
সূত্র–৩
প্রতিটি মৌলিক রসের নিজস্ব রসগতি থাকতে হবে।
সূত্র–৪
রসের সংখ্যা নির্দিষ্ট হতে পারে, কিন্তু রসের সংমিশ্রণ ও প্রকাশের সম্ভাবনা অসীম।
সূত্র–৫
নতুন রসের দাবি নাম দিয়ে নয়, স্বতন্ত্র নান্দনিক অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
এক বাক্যে ‘বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্ব’
সমগ্র তত্ত্বটিকে এক বাক্যে বলা যায়-
“বঙ্গরসায়ন হলো যাত্রাশিল্পের নান্দনিক অনুভবকে নবরসের শাস্ত্রীয় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে তার লোকজ, সম্পর্কীয়, সামাজিক, আত্মত্যাগী, স্বদেশচেতনামূলক ও চৈতন্যগত রস-অভিজ্ঞতাকে সম্প্রসারিত অষ্টাদশ রসের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করার একটি প্রস্তাবিত নন্দনতাত্ত্বিক তত্ত্ব।”
মূল ঘোষণা:-
নটরাজ এন এ পলাশের ‘বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্ব’
“নবরসে ভিত্তি- অষ্টাদশ রসে যাত্রার পূর্ণ রসপরিসর।”
নবরসকে অস্বীকার নয়- নবরসকে ভিত্তি করে যাত্রার অদৃশ্য রসপরিসরের অনুসন্ধান।
যাত্রার রস শুধু নয়টি অনুভূতির নাম নয়, এটি মানুষের জীবন, সম্পর্ক, সংগ্রাম, ত্যাগ, মাটি, স্বদেশ ও চৈতন্যের এক বহুমাত্রিক নান্দনিক যাত্রা।
সেই বহুমাত্রিকতার তাত্ত্বিক বিন্যাসই বঙ্গরসায়নের অষ্টাদশ রস।
এটি কোনো চূড়ান্ত বা অপরিবর্তনীয় ঘোষণা নয়, বরং গবেষণা, বিতর্ক, পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনার জন্য একটি প্রস্তাবিত কাঠামো।
যদি ভবিষ্যতে আরও কোনো রসের দাবি উত্থাপিত হয়, বঙ্গরসায়ন তার দরজা বন্ধ করবে না। বরং সেই দাবিকে স্বাতন্ত্র্য-পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
কারণ একটি তত্ত্বের শক্তি কেবল তার কতগুলো উত্তর আছে, তাতে নয়, বরং নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে পরীক্ষা করার ক্ষমতার মধ্যেও নিহিত।
বঙ্গরসায়ন তাই কোনো বন্ধ দরজা নয়- এটি একটি অনুসন্ধানের দরজা।
বাংলা যাত্রাশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য, লোকজ জীবন, মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক সংগ্রাম, স্বদেশচেতনা এবং চৈতন্যের গভীরে যে বহুমাত্রিক নান্দনিক অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে আছে, তাকে একটি সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে অনুধাবনের এই প্রচেষ্টাই ‘বঙ্গরসায়ন রসতত্ত্ব’।
নটরাজ এন এ পলাশ
সভাপতি
কালচারাল হারমনি
ও
বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন সোসাইটি
কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ঢাকা।
মন্তব্য করুন