“জীবনসঙ্গীর পাপে আজ আমার জীবন নিষ্পেষিত৷ বাবা-মায়ের কথা মেনে সোহেলকে বিয়ে না করলে হয়তো এমন খেসারত দিতে হতো না৷ জেনেশুনে একজন মাদকাসক্তকে বিয়ে করার এমন করুণ পরিণতিও হয়তো ভোগ করতে হতো না৷” কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে ফাঁসির প্রহর গুনতে গুনতে এভাবেই চরম আক্ষেপ ও অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন রাজধানী মিরপুরের চাঞ্চল্যকর শিশু রামিসা আক্তার (৮) হত্যা মামলার অন্যতম দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি স্বপ্না খাতুন৷
ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এই নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন উভয়কেই সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে৷ কারাগারের বিশেষ সূত্র জানিয়েছে— কনডেম সেলে কান্নাকাটিতেই স্বপ্নার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটছে৷ প্রথম সংসারে রেখে আসা নিজের সন্তান আর মায়ের মুখ মনে করে সারাক্ষণ চোখের জল ফেলছেন তিনি৷
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ: আদালতের নথি ও পল্লবী থানা পুলিশের অভিযোগপত্র (চার্জশিট) সূত্রে জানা গেছে— নিহত শিশু রামিসা আক্তার মিরপুরের পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল৷ গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না খাতুন তাকে কৌশলে নিজেদের সাবলেট ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে নিয়ে যান৷ এরপর স্বপ্নার স্বামী মাদকাসক্ত সোহেল রানা নিজের হীনকামনা চরিতার্থ করার জন্য শিশু রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন৷
ধর্ষণের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে সোহেল অত্যন্ত নির্মমভাবে রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করেন৷ লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা কেটে শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয় এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধবিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়৷ এরপর মস্তকবিহীন মূল রক্তস্নাত দেহটি বাথরুম থেকে এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয় এবং কাটা মাথাটি বাথরুমের ভেতরের একটি বড় বালতিতে রেখে দেওয়া হয়৷
যেভাবে ধরা পড়েন স্বপ্না: সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে এক পর্যায়ে ভবনের সিঁড়িতে স্বপ্নার কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা৷ ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্য বাসিন্দারা সমবেত হয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করেন৷
উত্তেজিত জনতা যখন বাইরে থেকে দরজার গোল লকের ফাঁকা দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন স্বপ্না ভেতর থেকে দরজা শক্ত করে আটকে রাখেন৷ এই সুযোগে প্রধান হত্যাকারী সোহেল রানা ঘরের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান৷ পরবর্তীতে লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে খাটের নিচে রামিসার মস্তকবিহীন লাশ এবং বালতিতে কাটা মাথা দেখতে পায়৷ এ সময় ঘরের ভেতর স্বপ্নাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জনতা তাকে অবরুদ্ধ করে পুলিশে সোপর্দ করে৷ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান তদন্ত শেষে আদালতে জানান— রামিসাকে হত্যার সময় স্বপ্না উপস্থিত ছিলেন এবং অপরাধীকে পালাতে সরাসরি সহায়তা করায় আদালত তাকে হত্যাকাণ্ডের ‘প্রত্যক্ষ সহযোগী’ হিসেবে সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে৷
ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত: কারাগারে স্বপ্নার দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়— তার বাড়ি নাটোরের সিংড়ার চৌগ্রামে৷ বাবার নাম জিহাদুল ইসলাম৷ ইতিপূর্বে তাঁর একটি বিয়ে হয়েছিল এবং সেখানে একটি সন্তান রয়েছে৷ ২০২৩ সালে প্রথম স্বামীর সাথে ডিভোর্সের পর পরিবারের অমতে ও স্থানীয়দের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রতিদিন ৫ পিস ইয়াবা সেবন করা চরম মাদকাসক্ত সোহেল রানাকে ভালোবেসে বিয়ে করেন তিনি৷ বিয়ের পর তারা মিরপুরের বিহারি ক্যাম্প হয়ে পল্লবীর এই ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতে শুরু করেন, যার মাত্র দুই মাসের মাথায় এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডটি ঘটে৷
