মধ্যপ্রাচ্যের রানিং সামরিক উত্তেজনা ও সীমান্ত সংঘাতের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে এক নজিরবিহীন ও হাই-ভোল্টেজ কূটনৈতিক মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন৷ চলতি জুলাই (২০২৬) মাসের শেষের দিকে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি৷ ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সীমান্ত ‘রূপরেখা চুক্তিটিকে’ (Framework Agreement) চূড়ান্তভাবে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই প্রেসিডেন্ট আউনের এই বিশেষ মার্কিন সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে৷
১৭ মিনিটের ফোনালাপ ও আন-নাহারের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার: হোয়াইট হাউস ও বৈরুত কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে— গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের মধ্যে প্রায় ১৭ মিনিটের একটি অত্যন্ত ‘ভালো’ ও ফলপ্রসূ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়৷ ওই ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর পরই এই ওয়াশিংটন সফরের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি জোরদার করা শুরু হয়েছে৷
লেবাননের প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক ‘আন-নাহার’ (An-Nahar)-কে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন নিজে এই হোয়াইট হাউস সফরের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন৷ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট আউন অকপটে স্বীকার করেন— ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পাদিত এই রূপরেখা চুক্তিটি লেবাননের সার্বভৌমত্বের দিক থেকে কোনো ‘আদর্শ’ চুক্তি নয়৷ তবে মাঠ পর্যায়ের রানিং বাস্তবতা এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি ইসরায়েলের সামরিক শক্তির পক্ষে থাকায় লেবাননের বৃহত্তর স্বার্থে ও নাগরিকদের সুরক্ষায় এই আপস বা চুক্তি মেনে নিতে হয়েছে৷
সেনা প্রত্যাহার ও নাবাতিহ জেলার বিশেষ মডেল: লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ওঠা সমালোচনার জবাবে জোসেফ আউন স্পষ্ট করে বলেন— “এটি একটি প্রাথমিক রূপরেখা মাত্র, ইসরায়েলের সঙ্গে এটি কোনো চূড়ান্ত বা স্থায়ী দাসত্ব চুক্তি নয়৷ লেবাননের সশস্ত্র সেনাবাহিনীর মধ্যে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরি নিয়ে বাইরের কারও বাজি ধরা উচিত হবে না এবং আমি আমার দেশের জনগণকে শুধু শুধু মরতে দেব না৷” তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন— এই চুক্তি সাময়িক হলেও লেবাননের নিজস্ব অধিকার রক্ষা এবং দখলকৃত ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার জাতীয় লড়াইকে কখনোই থামিয়ে দিতে পারবে না৷
প্রেসিডেন্ট তাঁর সাক্ষাৎকারে চুক্তির রানিং কৌশল ব্যাখ্যা করে আরও জানান— সীমান্ত থেকে পর্যায়ক্রমিক নিরাপত্তা পরিবর্তন ও সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়াটি লেবাননের নাবাতিহ জেলার জাওতার এলাকায় একটি পরীক্ষামূলক বিশেষ সামরিক মোতায়েনের মাধ্যমে শুরু হবে৷ এই নির্দিষ্ট মডেলের আওতায় লেবাননের জাতীয় সেনাবাহিনী নির্দিষ্ট কিছু সীমান্তবর্তী শহরের একক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেবে, যাতে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী পর্যায়ক্রমে ও নিরাপদে সেখান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিতে পারে৷
মার্কো রুবিও ও ইরান নীতি নিয়ে লেবাননের অবস্থান: তবে এই সেনা প্রত্যাহারের মাঝেও নিকটবর্তী কৌশলগত ‘আলি আল-তাহের’ পাহাড়ে ইসরায়েলি বিমান বা স্থলবাহিনী নতুন করে হামলা চালাতে পারে বলে লেবাননের সামরিক মহলে গভীর উদ্বেগ ও রানিং ঝুঁকি রয়েছে৷ এই সংকট সমাধানে প্রেসিডেন্ট আউন জানান— লেবাননের শীর্ষ কর্মকর্তারা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে (Marco Rubio) বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন, যাতে ওই আলি আল-তাহের পাহাড়ের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লেবানন সেনাবাহিনীর হাতেই ন্যস্ত থাকে৷ মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিশেষ প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন বলেও তিনি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন৷
একই সঙ্গে সম্প্রতি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় লেবাননের একজন সরকারি মন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলে কড়া সাফাই গেয়েছেন প্রেসিডেন্ট আউন৷ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট জানান— “ইরানের সঙ্গে লেবাননের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক খুবই স্বাভাবিক নিয়মে অব্যাহত রয়েছে এবং এটি কোনো শক্তির চাপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি৷” জুলাইয়ের শেষে ট্রাম্প-আউন বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের রানিং যুদ্ধাবস্থায় নতুন কোনো যুদ্ধবিরতির বার্তা আনে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়৷
