ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বন্ধুত্বই এখন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় দায়, উত্তাল ইসরাইল

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের সুদৃঢ় সম্পর্কের ওপর ভর করে যিনি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাজি ধরেছিলেন, সেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এখন সেই ট্রাম্পই সবচেয়ে বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন৷ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি করায় এখন নিজ দেশেই চরম রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন নেতানিয়াহু, কারণ দেশটির অধিকাংশ সাধারণ ইসরাইলি এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করছেন৷

চলতি শরতে হতে যাওয়া ইসরাইলের জাতীয় নির্বাচনে ট্রাম্পের সহায়তায় জয়ের আশা করছিলেন দীর্ঘমেয়াদি এই প্রধানমন্ত্রী৷ হোয়াইট হাউসে থাকা যে মানুষটিকে তিনি দেশের ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, তার সাহায্যেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছিলেন তিনি৷ তবে এর পরিবর্তে নেতানিয়াহুকে এখন এমন এক চুক্তি মুখ বুজে মেনে নিতে হচ্ছে, যা শত্রুরাষ্ট্র ইরানকে অক্ষত রাখছে৷ আর এটি সব মতের ইসরাইলিদের কাছেই একটি অপ্রীতিকর বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে৷ ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে শুরু করা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং ইসরাইলের কৌশলগত লক্ষ্য খুব কম অর্জিত হওয়ার কারণে ইতিমধ্যে জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর সমর্থন তলানিতে ঠেকেছে৷ তেল আবিব রেডিও ১০৩ এফএম-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কট্টরপন্থি ইসরাইলি বিশ্লেষক ও নেতানিয়াহুর সমর্থক ইনন মাগাল আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পিঠে ছুরিকাঘাত করেছেন’৷

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় নেতানিয়াহুর ওপর ইসরাইলিদের সমর্থন আগেই কমেছিল৷ এখন ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানে ট্রাম্পই যে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, তা আবারও স্পষ্ট হওয়ায় ইসরাইলিরা নতুন করে ধাক্কা খেয়েছে৷ দুই নেতার ফোনালাপে ট্রাম্পের গালিগালাজপূর্ণ তিরস্কার এই অংশীদারিত্বে নেতানিয়াহু তথা ইসরাইলের অধীনস্থ অবস্থানকেই বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট করেছে৷ গত রোববার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু সম্পর্কে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘সে খুব কঠিন একজন মানুষ৷ সত্যি বলতে, এটি করার জন্য তার আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত৷ কারণ ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে ইসরাইল দুই ঘণ্টাও টিকত না’৷ এর আগের দিন ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে জানান, বৈরুতে রোববারের ইসরাইলি বিমান হামলা ইরানের সঙ্গে মার্কিন আলোচনাকে প্রায় নস্যাৎ করে দিয়েছিল৷ তিনি দাবি করেন, নেতানিয়াহুকে ফোন করে তিনি গালমন্দ করেছেন এবং বলেছেন নেতানিয়াহুর ‘কোনো বিচারবুদ্ধি নেই’৷

লেবাননে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলি হামলা বন্ধ করতে ট্রাম্পের অনুরোধের পরই মূলত নেতানিয়াহুর ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অসন্তোষের বিষয়টি সামনে আসে৷ তবে অধিকাংশ ইসরাইলি এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান এবং তারা হিজবুল্লাহকে একটি অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখেন৷ নেতানিয়াহু যদি ট্রাম্পের আদেশে পিছিয়ে আসেন, তবে তিনি দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি করদ রাজ্যে পরিণত করেছেন বলে আরও বেশি সমালোচনার মুখে পড়বেন৷ এই পরিস্থিতিতে কট্টর ডানপন্থি জোট সরকারের মন্ত্রী ইতামার বেন গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘সব সম্মান বজায় রেখেই বলছি, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ নয়৷ আমরা এই চুক্তির অংশ নই, যা আমাদের নিরাপত্তার খেয়াল রাখে না এবং এটি আমাদের কোনোভাবেই বাধ্য করে না’৷ অন্য দিকে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদসহ মধ্যপন্থি রাজনীতিবিদরা ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মতো জটিলতা আগে থেকে অনুমান করতে না পারার জন্য সরাসরি নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন৷

ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গত সপ্তাহের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মানুষ মনে করেন ৭৬ বছর বয়সি নেতানিয়াহুর আর নির্বাচনে দাঁড়ানোই উচিত নয়৷ জরিপ বলছে, আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহযোগীরা ১২০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৫১টি আসন পেতে পারেন, যা সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত নয়৷ নেতানিয়াহুকে হঠানোর দৌড়ে এগিয়ে আছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত৷ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক এই চরম দেউলিয়াত্ব ছাড়াও ব্যক্তিগত জীবনে নেতানিয়াহু বর্তমানে প্রোস্টেট ক্যান্সার ও হৃদরোগের চিকিৎসাধীন রয়েছেন৷ পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে এবং প্রতি সপ্তাহে তাকে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে হচ্ছে৷ সব মিলিয়ে ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহুর এই নতি স্বীকারকে বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ ‘মক্কেল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার’ শামিল বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন৷

সূত্র: ব্লুমবার্গ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *