ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী শুক্রবার ঢাকা আসছেন

ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে আগামী শুক্রবার (১২ জুন) ঢাকায় আসছেন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদী৷ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে৷ কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাটের পরিবর্তে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাকে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানো দুই প্রতিবেশী দেশের চলমান কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়৷

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে দীনেশ ত্রিবেদীর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের নিয়োগ এবং আগমন উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷

গেল এপ্রিলে ভারত সরকার দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেয়৷ তিনি বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন৷ সাধারণত এসব গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট বা পেশাদার কূটনীতিকদের পাঠানো হলেও, বর্তমান স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বেছে নিয়েছেন৷ বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রিবেদী যেহেতু বাংলা ভাষায় সাবলীল এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীর জ্ঞান রাখেন, তাই বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মোদি সরকার তাঁকেই ঢাকায় পাঠানোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে, দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত করতে চায় দিল্লি৷

১৯৫০ সালের ৪ জুন নয়াদিল্লিতে জন্মগ্রহণ করা দীনেশ ত্রিবেদীর বর্তমান বয়স ৭৬ বছর৷ তিনি গুজরাটি বংশোদ্ভূত হলেও কলকাতায় বেড়ে উঠেছেন এবং বাংলা সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত৷ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা থেকে বাণিজ্যে স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, অস্টিন থেকে এমবিএ সম্পন্ন করা ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়৷ কংগ্রেস দিয়ে শুরু করে জনতা দল, তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে ২০২১ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন৷ পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন—রাজ্যসভায় দুবার (১৯৯০-৯৬ এবং ২০০২-০৮) এবং লোকসভায় ব্যারাকপুর কেন্দ্র থেকে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত৷ মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায় তিনি ভারতের রেলমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ ২০১৬-১৭ সালে তিনি ‘অসামান্য সংসদ সদস্য’ পুরস্কারেও ভূষিত হন৷

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কয়েকটি মূল চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়৷ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য এমন একজন ‘পলিটিক্যাল এনভয়’ বা রাজনৈতিক দূতের প্রয়োজন ছিল যিনি উভয় দেশের রাজনৈতিক মহলে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন৷

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু দুই সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটির মূল ভিত্তি দুই দেশের জনগণের মধ্যে৷ দীনেশ ত্রিবেদী শুধু একজন কূটনীতিক নন, তিনি একজন রাজনৈতিক যোগাযোগকারী৷ তাঁর মাধ্যমে দিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক স্তরের আলোচনা অনেক সহজ হবে এবং তিনি যদি এই মানুষে মানুষে যোগাযোগকে শক্তিশালী করতে পারেন, তাহলেই তাঁর ঢাকা মিশন সফল বলে বিবেচিত হবে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *