ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে নোয়াখালীর থানায় ৫ কোটি টাকার অভিযোগ

ফুটবল যে কেবলই মাঠের ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের কাছে রক্ত-মাংসের আবেগ এবং পরম ন্যায়বিচারের প্রশ্ন— সেটিরই এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত অভিনব উদাহরণ দেখা গেল নোয়াখালীর এক যুবকের মাঝে৷ চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার একটি ম্যাচে রেফারিংয়ে প্রকাশ্য পক্ষপাতের তীব্র অভিযোগ তুলে তিনি সরাসরি হাজির হয়েছেন স্থানীয় মডেল থানায়৷ উদ্দেশ্য তাঁর একটাই— বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA)-এর সভাপতি এবং উক্ত ম্যাচের প্রধান রেফারির বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত ফৌজদারি অভিযোগ বা এজাহার দায়ের করা৷

থানায় যখন বিশ্বকাপের রেফারিং বিতর্ক: অভিযোগকারী যুবকের নাম মো. রাকিব (২২)৷ তিনি নোয়াখালী সদর উপজেলার লক্ষণপুর সংলগ্ন মান্দারতলী গ্রামের বাসিন্দা৷ গতকাল বুধবার (৮ জুলাই) রাতে তিনি একগুচ্ছ ফুটবল সমর্থককে সাথে নিয়ে নোয়াখালীর সুধারাম মডেল থানায় এই লিখিত অভিযোগপত্রটি নিয়ে হাজির হন৷ তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনের অধীনে হওয়ায় এবং স্থানীয় থানার আইনি এখতিয়ারের বাইরে থাকায় পুলিশ শেষ পর্যন্ত লিখিত অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি৷

থানায় ডিউটি অফিসারের হাতে অভিযোগপত্রটি তুলে দেওয়ার পর প্রথমে কিছুটা চরম বিস্মিত ও হতভম্ব হয়ে পড়েন সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা৷ সাধারণ গ্রামীণ মারামারি, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা মোবাইল চুরির অভিযোগ নিতে অভ্যস্ত থানার কর্মকর্তাদের সামনে এবার সশরীরে হাজির হলো বিশ্বকাপের বিশ্ব কাঁপানো রেফারিং বিতর্ক৷

এজাহারে ফিফার বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার অন্যায়ের রানিং বিবরণ: যুবক রাকিবের লিখিত দাবি অনুযায়ী— ম্যাচের মাত্র ১৪তম মিনিটে মিশর দল একটি অত্যন্ত দর্শনীয় ফিল্ড গোল করে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পরপরই ম্যাচের প্রধান রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরে ফিফা সভাপতির অদৃশ্য প্ররোচনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন৷ এর ঠিক ৫ মিনিটের মাথায় তিনি আর্জেন্টিনাকে সম্পূর্ণ অন্যায্য ও বিতর্কিত একটি পেনাল্টি উপহার দিয়ে খেলায় জোরপূর্বক সমতা আনেন৷ পরবর্তীতে ম্যাচের ২৫তম মিনিটে মিসর দলের আরেকটি সম্পূর্ণ বৈধ ও অনবদ্য গোল রেফারি প্রথমে মেনে নিলেও, মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় রহস্যজনক কারণে তা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ‘ভিএআর’ (VAR) ছাড়াই বাতিল ঘোষণা করেন, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মিসর সমর্থকের হৃদয় টুকরো টুকরো করে দেয়৷

অভিযোগে আরও কঠোরভাবে বলা হয়— ম্যাচের শেষভাগে মিশরীয় ফুটবলাররা পুনরায় গোল করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করলে রেফারি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিশরের প্রধান খেলোয়াড়দের একের পর এক অন্যায্য হলুদ কার্ড এবং মিশরের প্রধান কোচকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে লাল কার্ড প্রদর্শন করে মাঠ থেকে বের করে হয়রানি করেন৷ এতে মিশর দলের খেলোয়াড়দের মানসিক মনোবল ভেঙে পড়ে এবং আর্জেন্টিনার জন্য ম্যাচ জয়ের রানিং পথ সহজ করে দেওয়া হয়৷ বাদী দাবি করেন— ফিফা কর্তৃপক্ষের এমন চরম নগ্ন পক্ষপাতিত্ব এবং রেফারিংয়ের নামে জালিয়াতির কারণে তিনি এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মিশর সমর্থক চরম হতাশা ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়েছেন৷ এই মানসিক আঘাতের ফলে অনেক সমর্থকের সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয় ঘটার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে৷ আর এই অপূরণীয় ক্ষতির কারণেই ফিফা থেকে সরাসরি ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিবাদীদের বিচারের মুখোমুখি করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন৷

আদালত ও মানববন্ধনের রানিং প্রস্তুতি: সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন— “এক যুবক ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে এমন একটি লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় এসেছিলেন৷ তবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংক্রান্ত এ ধরনের হাই-প্রোফাইল বিষয়ে স্থানীয় থানার কোনো ধরনের আইনি এখতিয়ার নেই৷ বিষয়টি তাকে আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়ে বলা হয়েছে৷”

এদিকে আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে মো. রাকিব দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন— “ম্যাচে আর্জেন্টিনার পক্ষে যা হয়েছে, তা কোনো সচেতন ফুটবলপ্রেমী মেনে নিতে পারে না৷ আমি মনে করি, কোটি কোটি দর্শকের পবিত্র আবেগের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে৷ পুলিশ অভিযোগ নেয়নি বলে লড়াই থামবে না, আমি এখন নোয়াখালীর আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি৷ প্রয়োজনে জেলা শহরে মানববন্ধনসহ অন্যান্য তীব্র প্রতিবাদী কর্মসূচিও পালন করব৷” এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই নোয়াখালীজুড়ে তুমুল হাসির রোল ও চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে৷ স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীরা মজা করে মন্তব্য করছেন— “ভিএআর (VAR) যদি মাঠে কথা না শোনে, তাহলে নোয়াখালীর থানাই এখন শেষ ভরসা৷”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *