বিশ্বকাপের আগে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে আর্জেন্টিনা, তবে সমর্থকদের তাড়া করছে ৩২ বছরের এক ‘অভিশপ্ত’ ইতিহাস!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সর্বশেষ র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল. বিশ্বকাপের আগমুহূর্তে আলবিসেলেস্তেদের এই এক নম্বর অবস্থান বিশ্বজুড়ে কোটি সমর্থকদের জন্য যেমন চরম গর্বের, তেমনি ফুটবল ইতিহাসের একটি অদ্ভুত ও রহস্যময় পরিসংখ্যান কিছুটা দুশ্চিন্তার কারণও হয়ে উঠছে আর্জেন্টিনা শিবিরের জন্য.

গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচগুলোর ফলাফলের পর ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে এই বড় ধরনের ওলটপালট আসে. হাই-ভোল্টেজ প্রীতি ম্যাচে আইভরিকোস্টের কাছে ২-১ গোলে হেরে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হারায় শক্তিশালী ফ্রান্স, যার ফলে তারা শীর্ষস্থান থেকে তিন নম্বরে নেমে যায়. একই সময়ে স্পেনও ইরাকের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট খোয়ায়. প্রতিদ্বন্দ্বীদের এমন পয়েন্ট হারানোর সুযোগে রেটিং পয়েন্টের ব্যবধানে সবাইকে ছাড়িয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানটি নিজেদের করে নেয় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা.

র‍্যাঙ্কিংয়ের এই শীর্ষস্থান যেমন আনন্দের, ঠিক তেমনি এর সাথে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত ও রূঢ় ইতিহাস. ১৯৯২ সালে ফিফা কর্তৃক আনুষ্ঠানিক র‍্যাঙ্কিং ব্যবস্থা চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত কোনো বিশ্বকাপেই, টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে এক নম্বর অবস্থানে থাকা দলটি শেষ পর্যন্ত শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে পারেনি! ফুটবল বিশ্বে এটি এক প্রকার ‘র‍্যাঙ্কিং অভিশাপ’ হিসেবেও পরিচিত.

এই অদ্ভুত প্রবণতার শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ থেকে. সেবার টুর্নামেন্ট শুরুর আগে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ছিল শক্তিশালী জার্মানি, কিন্তু মাঠে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয়; আর শিরোপা জেতে ব্রাজিল.

এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপের আগে শীর্ষে থাকা ব্রাজিল ফাইনালে উঠলেও স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয়ে মাঠ ছাড়ে. ২০০২ বিশ্বকাপে এক নম্বরে থাকা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স তো গ্রুপ পর্ব থেকেই লজ্জাজনক বিদায় নেয়. পরবর্তী আসরগুলোতেও একই ধারা দেখা যায়; ২০০৬ সালে শীর্ষে থাকা ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছিটকে পড়ে. ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে যথাক্রমে শীর্ষ দল ব্রাজিল ও স্পেন শিরোপা জিততে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়. ২০১৮ সালে এক নম্বর র‍্যাঙ্কিং নিয়ে মাঠে নামা জার্মানি পুনরায় গ্রুপ পর্বের গেরো পার হতে পারেনি.

সর্বশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও এই নিয়তির কোনো পরিবর্তন হয়নি. টুর্নামেন্টের আগে দীর্ঘ সময় শীর্ষে থাকা হট-ফেভারিট ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয়. অথচ সেবার তিন নম্বরে থেকে টুর্নামেন্ট শুরু করে ইতিহাস গড়ে নিজেদের তৃতীয় শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা.

ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে নামার আগে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনার সামনে একদিকে যেমন টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের আত্মবিশ্বাসের শক্ত ভিত্তি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে অতীতের এক চরম বৈরী পরিসংখ্যান. ফুটবল ইতিহাস কি এবারও তার পুরনো নিয়মেই হাঁটবে, নাকি আলবিসেলেস্তেরা ৩২ বছরের সেই ঐতিহাসিক মিথ ও ধারা ভেঙে বিশ্বমঞ্চে নতুন কোনো মহাকাব্য লিখবে— তার উত্তর মিলবে আগামী মেগা টুর্নামেন্টেই.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *