মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কা বাংলাদেশে; বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগাম ঈদের ছুটি

বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভর করে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত জ্বালানি সংকট পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং জ্বালানি রেশনিং (নিয়ন্ত্রিত বণ্টন) শুরু করেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে জরুরি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে কর্তৃপক্ষ সোমবার থেকে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে, যার ফলে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপ কেবল বিদ্যুৎ ব্যবহারই কমাবে না, বরং যানজট কমিয়ে জ্বালানি অপচয় রোধেও সহায়তা করবে।

তারা আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই আগাম ছুটি দেশের বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলো আগে থেকেই বন্ধ থাকায়, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এখন বন্ধ থাকবে। জ্বালানি চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায়, সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনা এবং মজুত ঠেকাতে গত শুক্রবার থেকে জ্বালানি বিক্রির ওপর দৈনিক সীমা (রেশনিং) আরোপ করেছে বাংলাদেশ।

সার্বিক কৃচ্ছ্রসাধন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সরকার বিদেশি কারিকুলামের স্কুল এবং বেসরকারি কোচিং সেন্টারগুলোকেও এই সময়ে কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বলেছে। এর পাশাপাশি, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং অফিসগুলোতে প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় আলো ও বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে উৎসাহিত করতে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ফলে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ায় তেল ও গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে।

তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তার পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে চারটির কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, যাতে সেই গ্যাস বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে পাঠিয়ে দেশব্যাপী লোডশেডিং এড়ানো যায়। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশ—যা বিশ্বের অষ্টম জনবহুল রাষ্ট্র—সরবরাহ ঘাটতি মেটাতে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি (LNG) কিনছে এবং অতিরিক্ত কার্গোর সন্ধান করছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ব্যবহার কমাতে এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও আমদানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সবকিছু করছি।”

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বিদ্যুৎ খাতের জন্য সাময়িক স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে তারা সতর্ক করেছেন যে, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে এবং শিক্ষাবর্ষের সূচিতে এর প্রভাব পড়লে শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। কর্তৃপক্ষ এই ছুটি কতদিন স্থায়ী হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ইঙ্গিত না দিলেও, পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে ঈদের ছুটির পর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *