গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেসব বদলি-পদায়ন করা হয়েছে, তার কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা ও বাংলাদেশ গেজেটে নির্ধারিত পদায়ন কাঠামোর যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে ‘লটারির মাধ্যমে’ ব্যাপকভাবে বদলি-পদায়ন করা হলে তা নির্ধারিত নীতিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, বদলি ও পদায়ন প্রশাসনের স্বাভাবিক ক্ষমতার অংশ হলেও সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরও প্রচলিত আইন, বিধি, প্রজ্ঞাপন ও নিজস্ব অনুমোদিত নীতিমালার সীমার মধ্যে আবদ্ধ। ফলে ব্যক্তির জ্যেষ্ঠতা, সততা, কর্মদক্ষতা, মেধা, কর্মস্পৃহা, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের মেয়াদ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিবেচনা না করে যদি কেবল লটারি বা নির্বিচার পদ্ধতিতে পদায়ন করা হয়, তাহলে সেটি নীতিমালার উদ্দেশ্য ও কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গেজেটেই রয়েছে পদায়নের স্পষ্ট কাঠামো : বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট নীতিমালার ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা যে কর্মস্থলে পদায়নের আগ্রহ প্রকাশ করবেন, সেখানে কর্মরত কর্মকর্তার মেয়াদের পূর্ণতা, দক্ষতা, সততা ইত্যাদি বিবেচনা করে তাকে পদায়ন করতে হবে। অর্থাৎ পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কর্মজীবনের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনার কথা নীতিমালাতেই রয়েছে।
১১ নম্বর ধারায় আরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, সততা ও সন্তোষজনক চাকরির ভিত্তিতে পদায়নের বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আবেদনকারী কর্মকর্তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিজের সমস্যা, প্রয়োজন বা অবস্থান উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়ার কথাও রয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—এই ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বদলি সংক্রান্ত সুপারিশ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ বদলি-পদায়নকে কোনো ব্যক্তিগত সুপারিশ, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা নির্বিচার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে রাখার বিষয়টি নীতিমালায় গুরুত্ব পেয়েছে।
‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির অফিস—লটারিতে কি মিলবে এই ভারসাম্য ? নীতিমালার ১২ নম্বর ধারায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের বিভাগ, উপ-বিভাগ ও শাখাগুলোকে কাজের পরিধি, প্রকৃতি, গুরুত্ব এবং রাজধানী/বিভাগ/জেলা শহর থেকে দূরত্ব বিবেচনায় ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’—এই তিন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। এরপর উপধারায় বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের এসব কার্যালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, সততা, কর্মদক্ষতা, মেধা ও কর্মস্পৃহা বিবেচনা করতে হবে। এখানেই ‘লটারি’ পদ্ধতি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হচ্ছে। কারণ একজন কর্মকর্তাকে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মস্থলে পাঠানোর ক্ষেত্রে যদি তার জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা, সততা, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা ও চাকরির মেয়াদ বিবেচ্য হয়, তাহলে শুধুমাত্র দৈবচয়ন বা লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হলে এসব মানদণ্ড বাস্তবে কীভাবে মূল্যায়ন করা হলো—তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
‘ক’ শ্রেণির অফিসে পদায়নেও রয়েছে বাধ্যবাধকতা :
নীতিমালার ১২(খ) ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের পূর্বানুমতি ও বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া পদোন্নতির পর প্রথম পর্যায়ে ন্যূনতম দুই বছর ‘খ’ বা ‘গ’ শ্রেণির কার্যালয়ে কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়া ‘ক’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। একই ধারার ১২(গ)-তে বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তাকে একই পদে পরপর দুই মেয়াদে ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগরীর ‘ক’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। এছাড়া উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের জোন/সার্কেল কার্যালয়ে Estimator হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রেও ‘ক’, ‘খ’ বা ‘গ’ শ্রেণির কার্যালয়ে ন্যূনতম তিন বছর চাকরির অভিজ্ঞতাকে পূর্বশর্ত করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মকর্তার চাকরির ইতিহাস, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, শ্রেণিভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও একই ধরনের পদে পূর্ববর্তী মেয়াদ কি যাচাই করা হয়েছে ? যদি হয়ে থাকে, সেই যাচাইয়ের ভিত্তি কী ? আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে নীতিমালার সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর বাস্তব প্রয়োগ কোথায় ?
বিভাগীয় মামলা থাকলে আলাদা বিধান : ১৩ নম্বর ধারায় আরও একটি সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হলে দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছর তাকে ‘ক’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন না করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে পদায়ন করতে পারবে। অর্থাৎ একই নীতিমালায় বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিস্থিতির জন্য পৃথক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো রাখা হয়েছে। ফলে একটি অভিন্ন লটারি পদ্ধতিতে সবাইকে একইভাবে বিবেচনা করলে ব্যক্তিভেদে প্রযোজ্য এসব বিধান কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ?
প্রথম নিয়োগ ও প্রশিক্ষণেও রয়েছে স্পষ্ট শর্ত : ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া চাকরিতে প্রথম যোগদানের পর ন্যূনতম তিন মাসের মৌলিক বিভাগীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা যাবে না।
১৫ নম্বর ধারায় প্রত্যেক কর্মকর্তাকে চাকরির প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠপর্যায় ও দাপ্তরিক পর্যায়ে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে পদায়নের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ পদায়নের দর্শনটি নিছক ‘কোথায় খালি পদ আছে’—এমন সরল হিসাবের ওপর দাঁড়ানো নয়। বরং কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্য স্পষ্ট। লিয়েন, শিক্ষাছুটি ও প্রেষণেও সময়সীমা নির্ধারিত
১৬ নম্বর ধারায় অন্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থার চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রেষণে পদায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৭ নম্বর ধারায় লিয়েন ও শিক্ষাছুটি থেকে ফেরার পর কর্মকর্তাকে মাঠপর্যায়ে ন্যূনতম দুই বছর চাকরি করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের জন্য অবশ্য বিশেষায়িত পদে পদায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এসব বিধান থেকে স্পষ্ট যে, পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল ও কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করার নীতিগত উদ্দেশ্য রয়েছে।
বদলির আদেশ পাওয়া কর্মকর্তার ক্ষমতা নিয়েও বিধান : নীতিমালার ১৮ নম্বর ধারা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে— বদলির আদেশপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা তার অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বদলি করতে পারবেন না। এই বিধান প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহার ঠেকানোর একটি সুরক্ষা কাঠামো হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নের পর প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় এই বিধানগুলো কতটা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে ?
মন্ত্রণালয়ই অস্পষ্টতার চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ—কিন্তু নীতিমালার বাইরে নয় : নীতিমালার ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নীতিমালার কোনো অস্পষ্টতার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো বিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা আর সেই বিধানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার ক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়।
নীতিমালার কোনো ধারার প্রয়োগে অস্পষ্টতা দেখা দিলে মন্ত্রণালয় তার ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যার মাধ্যমে নীতিমালায় নির্ধারিত মৌলিক মানদণ্ড—যেমন জ্যেষ্ঠতা, সততা, দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বা নির্ধারিত মেয়াদ—সম্পূর্ণ অকার্যকর করা যায় কি না, সেটিই এখন আইন ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিষয় হতে পারে।
