রাজধানীর বনানী এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয় ইসমাইল হোসেন (৫০) নামের এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে থাকা আসল রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। বাসে ভাড়া আদায়ের সময় নিহতের কোমরে থাকা জমি বিক্রির মোটা অঙ্কের টাকার বান্ডিল দেখেই তাকে হত্যার নৃশংস পরিকল্পনা করে বাসটির সুপারভাইজার। পরবর্তীতে চালক ও সহকারীর সহায়তায় চলন্ত বাসেই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে মরদেহ এক্সপ্রেসওয়েতে ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়।
এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের চালকসহ তিনজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— রাজ ক্লাসিক বাসের মূল চালক সোহেল রানা (৪১), বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং চালকের সহকারী (হেলপার) মো. মনির হোসেন (১৯)।
মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের বিবরণ:
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল পৌনে ৯টার দিকে বনানী থানাধীন স্টেডিয়াম-সংলগ্ন এলাকায় এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর এক ব্যক্তির অজ্ঞাত লাশ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। বনানী থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
উদ্ধারের সময় নিহতের মুখ ও দুটি হাত সম্পূর্ণ স্কচটেপ দিয়ে পেঁচানো ছিল এবং গলায় স্পষ্ট আঘাতের কালো দাগ পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত হয়ে পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) পরীক্ষা করে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করে। নিহত ব্যক্তির নাম ইসমাইল হোসেন। পরবর্তীতে তাঁর পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে ছবি দেখে লাশটি নিখোঁজ ইসমাইলের বলে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করেন।
টাকার লোভে যেভাবে হয় নির্মম হত্যাকাণ্ড:
পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক হোসেন জানান, নিহতের স্বজনদের তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার আগের ঘটনাপ্রবাহ বের করা হয়। নিহত ইসমাইল হোসেন সম্পত্তি জমি বিক্রি করে পাওয়া নগদ টাকা কোমরে বেল্ট আকারে বেঁধে নিয়ে রাজ ক্লাসিক বাসে উঠে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। বাসে যাত্রী কম থাকার সুযোগে ভাড়া আদায়ের সময় বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন ইসমাইলের কোমরে পেঁচানো টাকার বান্ডিল দেখতে পায়।
টাকার বান্ডিল দেখে লিমনের মনে লোভ জাগে এবং সে তাৎক্ষণিকভাবে বাসচালক সোহেল রানার সাথে বিষয়টি নিয়ে ফিসফিস করে ইসমাইলের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত করে। এই নারকীয় পরিকল্পনায় পরবর্তীতে চালকের সহযোগী মনির হোসেন যুক্ত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুযোগ বুঝে চলন্ত বাসেই ইসমাইলকে কাবু করে তার হাত-মুখ স্কচটেপ দিয়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। হত্যা শেষে তার কাছ থেকে জমি বিক্রির সমস্ত টাকা ছিনিয়ে নিয়ে সুবিধাজনক স্থানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর মরদেহ ফেলে গাড়ি নিয়ে চম্পট দেয় তারা।
পুলিশের দ্রুত ও কার্যকর অভিযানের ফলে জড়িত তিন পাষণ্ডকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনার সঙ্গে বাস মালিক, অন্য কোনো সহকারী বা তৃতীয় কোনো চক্র জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জোর তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মন্তব্য করুন