রণাঙ্গন থেকে রাষ্ট্রনায়ক: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গৌরবময় জীবনগাথা

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব কেবল সময়ের ফ্রেমে আবদ্ধ থাকেন না, বরং হয়ে ওঠেন একটি জাতির সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই এক ঐতিহাসিক নাম। স্বাধীনতার রণাঙ্গনের সাহসী সেনানায়ক থেকে শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদনমুখী রাষ্ট্রচিন্তার এক বলিষ্ঠ রূপকার ছিলেন তিনি।

১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়ীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। পিতা মনসুর রহমান ও মাতা জাহানারা খাতুনের এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দূরদর্শী। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগদানের পর মেধা ও সামরিক দক্ষতার কারণে দ্রুতই একজন সফল সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে নতুন গতি দেন জিয়াউর রহমান। তার সেই আহ্বান যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের হৃদয়ে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন তিনি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান। তিনি দেশের হাল ধরেন এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান দিক ছিল দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করা। তার উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলো পুনর্গঠনের সুযোগ পায় এবং সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় নতুন গতি ফেরে।

তিনি জাতীয় রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা সামনে আনেন; যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, ভূখণ্ড, স্বাধীনতার চেতনা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৭৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি’ (বিএনপি)।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার উন্নয়ন দর্শনের মূলভিত্তি ছিল গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনীতি। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল, ‘গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।’ তার শাসনামলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’ শুরু হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতেন তিনি। রণাঙ্গনের এই বীর সেনানায়ক তার দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তা ও মাটির মানুষের নেতা হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *