ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ব্যাপক হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত ও ৯৬ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরনগরী ওডেসা। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, হামলায় রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের ১২৯টি ড্রোনের পাশাপাশি ইস্কান্দার-এম/কেএন-২৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আটটি কালিবর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি খ-৫৯/৬৯ গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ব্যবহৃত ড্রোনগুলোর প্রায় অর্ধেক ছিল জেট ইঞ্জিনচালিত।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১১০টি আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করেছে। এর মধ্যে ছয়টি কালিবর ক্ষেপণাস্ত্র, দুটি খ-৫৯/৬৯ ক্ষেপণাস্ত্র, একটি এস-৮০০০ বান্দেরোল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০১টি ড্রোন রয়েছে।
রুশ হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী ওডেসা। স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে শহরটির দিকে রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এগিয়ে আসার কথা জানায় ইউক্রেনের বিমানবাহিনী।
হামলায় একটি বহুতল আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওডেসা অঞ্চলের গভর্নর ওলেহ কিপার জানান, হামলায় শহরটির একটি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পরে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে আহতের সংখ্যাও বাড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওডেসা অঞ্চলে অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে পাঁচ মাস বয়সী একটি শিশু ও ১৭ বছরের এক কিশোর রয়েছে। কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলও রুশ হামলার শিকার হয়েছে। দিপ্রো শহরে ড্রোন, কামান ও আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা বোমার হামলায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন, গ্যারেজ ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন নিহত ও ১৯ জন আহত হয়েছেন।
ক্রিভি রিহ শহরের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে। এতে একজন নিহত ও তিনজন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৫৪ বছর বয়সী একজনের অবস্থা গুরুতর।
দিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা জানান, ওই অঞ্চলে মোট দুজন নিহত ও অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজন শিশু রয়েছে।
জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৫টি শহর ও গ্রামে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। জাপোরিঝঝিয়া শহরে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলে দুজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন।
দোনেৎস্ক অঞ্চলে চারজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন গভর্নর ভাদিম ফিলাশকিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্লোভিয়ানস্কে দুজন, ক্রামাতোরস্কে একজন এবং ইয়াসনোহিরকায় একজন নিহত হয়েছেন।
কিয়েভ অঞ্চলেও রুশ ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। ব্রোভারি, ওবুখিভ, বুচা, বোরিসপিল ও ভিশহোরোদ এলাকায় হামলায় ১৫টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসবের মধ্যে বাড়ি, যানবাহন, গুদাম, হ্যাঙ্গার ও বিদ্যুৎ লাইন রয়েছে।
সুমি অঞ্চলের মিরোপিলিয়া এলাকায় রুশ ড্রোন হামলায় ৬৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। নোভোস্লোবিডস্কি এলাকায় আরেক হামলায় ৬৪ বছর বয়সী একজন আহত হন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই অঞ্চলের ২৫টি এলাকায় এক দিনে ৫০টির বেশি হামলা হয়েছে।
খারকিভ অঞ্চলের খারকিভ শহরে হামলায় ৩২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। অন্য একটি এলাকায় ১৯ বছর বয়সী এক যুবক আহত হন। শহরসহ আরও সাতটি এলাকায় গাইডেড বোমা ও বিভিন্ন ধরনের ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
খেরসন অঞ্চলে রুশ হামলায় ১৮ জন আহত হয়েছেন। আবাসিক এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সামাজিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৫টি আবাসিক ভবন, দোকান, একটি পেট্রল স্টেশন, সার্ভিস স্টেশন, অ্যাম্বুলেন্স ও কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের টলিয়াত্তিকাউচুক কারখানায় হামলার দাবি করেছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের ভাষ্য, ১১ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের রাতে ওই হামলায় কারখানাটিতে আগুন ধরে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হয়নি।
ইউক্রেনের দাবি, কারখানাটি রাশিয়ার সামরিক-শিল্প খাতে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করে। সেখানে সিনথেটিক রাবার, মোনোমার, বিভিন্ন ধরনের ভগ্নাংশ এবং উচ্চ-অকটেন জ্বালানির সংযোজক উৎপাদন করা হয়।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, সিনথেটিক রাবার স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক রকেটের কঠিন জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এর আগে রুশ-অধিকৃত দোনেৎস্ক অঞ্চলের স্নিঝনে শহরের একটি মেশিন নির্মাণ কারখানায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলার খবর প্রকাশ করে ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যম ইউক্রাইনস্কা প্রাভদা। ওই কারখানায় গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির কথা জানা গেছে।
ইউক্রেনে রুশ হামলার মধ্যেই রাশিয়ার তেল পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর দাবি করেছে কিয়েভ।
ইউক্রেনের মানববিহীন ব্যবস্থা বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ব্রোভদি জানান, গত প্রায় ১০ সপ্তাহে আজভ ও কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার শ্যাডো ফ্লিটের ২৮৫টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।
তার দাবি, জুলাইয়ে ২১৫টি, আগস্টে ৫৪টি এবং ১ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ১৬টি জাহাজে হামলা চালানো হয়।
ব্রোভদি দাবি করেন, এসব হামলার ফলে আজভ সাগর ও কের্চ প্রণালিতে রাশিয়ার শ্যাডো ফ্লিটের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষ্ণসাগরের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও এসব জাহাজের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইউক্রেনের ওই কমান্ডার একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছেন, এতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইউক্রেনীয় মানববিহীন ব্যবস্থা বাহিনীর হামলার দৃশ্য রয়েছে। জাহাজটিকে একটি রুশ হেলিকপ্টার পাহারা দিচ্ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে উভয় পক্ষের সামরিক হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির এসব দাবির স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি।
মন্তব্য করুন