Hafizur Rahman
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:১০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রজিপুরের ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগার

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রজিপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী রজিপুর আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন সমিতি ও পল্লী উন্নয়ন গ্রন্থাগার বর্তমানে চরম অবহেলা ও অযত্নে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। একসময় গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষাবিস্তার, সামাজিক সচেতনতা ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে জেলার মধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানটি আজ জরাজীর্ণ ভবন ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ৫ এপ্রিল রজিপুর গ্রামের সাংবাদিক ও সমাজসেবক জয়দেব মল্লিক (বিশ্বজিৎ)-এর উদ্যোগে, ভিডিপি দলনেত্রী লক্ষীরানী মল্লিক, গণেশ মল্লিক ও দিলীপ হালদারসহ কয়েকজন সমাজসচেতন ব্যক্তির সহযোগিতায় স্বল্পসংখ্যক সদস্য নিয়ে রজিপুর আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন সমিতি যাত্রা শুরু করে। সমিতির নিবন্ধন নম্বর ৩২০। সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রজিপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবু পূর্ণচন্দ্র মল্লিক তিন শতক জমি দান করেন, যেখানে পরবর্তীতে সমিতির নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে ওঠে।
সমিতির সম্পাদক জয়দেব মল্লিক (বিশ্বজিৎ)-এর উদ্যোগে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পল্লী উন্নয়ন গ্রন্থাগার। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গ্রন্থাগারটি এলাকায় জ্ঞানচর্চা, সংবাদপত্র পাঠ, সামাজিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় এখানে নিয়মিত জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র পাঠ, বইপড়া, শিক্ষামূলক আলোচনা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। এমনকি গ্রামের বহু গুরুত্বপূর্ণ সালিশি বৈঠক ও সামাজিক সিদ্ধান্তও এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই সম্পন্ন হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রজিপুর গ্রামের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রজিপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা পরবর্তীতে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে বর্তমান রজিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি গ্রন্থাগার বা সমিতি নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনের অংশ।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে অনন্য অবদান রাখায় রজিপুর আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন সমিতি একাধিক স্বীকৃতি অর্জন করে। জেলার আটটি থানার মধ্যে মনিরামপুর উপজেলার এই সমিতিকে জেলার শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে সাফল্যের জন্য রজিপুর গ্রামকে যশোর জেলার শ্রেষ্ঠ গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সমিতিকে পুরস্কৃত করা হয়।
এছাড়া সমিতির উদ্যোগে গ্রামের ৮৬টি পরিবারের মধ্যে ৭৯টি পরিবারে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন, হাঁস-মুরগি পালন বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ, দরিদ্র কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ, বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এসব অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে তৎকালীন যশোর জেলা অ্যাডজুটেন্ট মো. জাকির হোসেন সমিতিকে জেলার শ্রেষ্ঠ সমিতি হিসেবে পুরস্কৃত করে সদস্যদের মাঝে একটি টেলিভিশন হস্তান্তর করেন।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে একটি প্রবল ঝড়ে সমিতি ও গ্রন্থাগারের ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এরপর ভবনটি পুনঃসংস্কারের জন্য যশোর জেলা কমান্ড্যান্টের নিকট আবেদন করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বর্তমানে সমিতি ও গ্রন্থাগারের নিয়মিত কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।
প্রতিষ্ঠাতা ও সমিতির সম্পাদক জয়দেব মল্লিক (বিশ্বজিৎ) বলেন, “একসময় এই প্রতিষ্ঠান ছিল গ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকে শিক্ষা, সচেতনতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ সেই প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় আমরা হতাশ।”
তিনি আরও বলেন, “একটি গ্রন্থাগার ধ্বংস হওয়া মানে কেবল একটি ভবনের ক্ষতি নয়; এটি একটি এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হারিয়ে যাওয়ার শামিল। দ্রুত সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।”
এলাকাবাসী, সমিতির সদস্য-সদস্যা এবং সচেতন মহল অবিলম্বে রজিপুর আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন সমিতি ও পল্লী উন্নয়ন গ্রন্থাগারের ভবন সংস্কার এবং কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আনসার ও ভিডিপি অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তাদের ভাষায়, “যে প্রতিষ্ঠান একসময় গ্রামকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছিল, আজ সেই প্রতিষ্ঠানই ধ্বংসের মুখে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঠাকুরগাঁওয়ে ১২৩ বোতল ফেন্সিডিল জাতীয় মাদক ও ৬২০ পিস ইয়াবাসহ দুইজন গ্রেপ্তার

১

পোরশায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

২

চাঁপাইনবাবগঞ্জে যুবক হত্যা, চাকুসহ একজন গ্রেপ্তার

৩

সোনারগাঁও ক্রসিংয়ে পুলিশ সার্জেন্ট পলাশের তৎপরতায় অপহৃত দুই শিশু উদ্ধার

৪

উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উদ্ভাবনী চিন্তা ও মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে: শিল্পমন্ত্রী

৫

জন্মগত ঠোঁট ও তালু কাটা শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ: ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী

৬

ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ বছরের শিশুকে নির্জনে নিয়ে ধর্ষণ, ধর্ষক হৃদয় চন্দ্র পলাতক

৭

সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের বারসহ ৪ বারে এনবিআরের অভিযান, বিপুল অবৈধ মদ উদ্ধার

৮

ডিবির হাতে জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার

৯

কমর উদ্দিন ব্যাপারী জামে মসজিদে চেয়ারম্যান প্রার্থী এডভোকেট ইউনুস সুমনের গণসংযোগ ও দোয়া প্রার্থনা

১০

পঁচিশ’শ পিস ইয়াবাসহ নোয়াখালীতে ডিবির হাতে গ্রেফতার

১১

শেনবাগের ১নং ইউনিয়ন ৮নং ওয়ার্ড বিরাহিমপুরবাসীর পক্ষ থেকে মানববন্ধন কর্মসূচি

১২

ধামইরহাটে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস পালিত

১৩

ঠাকুরগাঁওয়ে নাগর নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ, পরে উদ্ধার কিশোরের মরদেহ

১৪

দূর্গা মন্ডপ পরিদর্শন করেন আলহাজ্ব মো: মনজুরুল ইসলাম এমপি

১৫

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নির্মিত মসজিদের উদ্বোধন

১৬

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর পাশে পৌর প্রশাসক জেবুননাহার শাম্মী, আর্থিক অনুদানে মানবিক উদ্যোগের নতুন ধারা

১৭

ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০ বিজিবির অভিযানে ২১৬ পিস ট্যাপেন্টাডলসহ যুবক আটক

১৮

বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ণ ছাড়াই মেরামত করা হচ্ছে সোনারগাঁও বড় সরদার বাড়ি

১৯

জাতীয় উপাদানশীলতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‍্যালি

২০