দিনের শেষে গভীর একটি ঘুম মানেই ছিল শরীরের পূর্ণ বিশ্রাম। কিন্তু বর্তমান সময়ের চিত্রটি ভিন্ন। অনেকেই হয়তো ঘড়ি ধরে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু সকালে ওঠার পর সেই একই ক্লান্তি আর অবসাদ গ্রাস করছে শরীরকে। গবেষকরা বলছেন, সমস্যাটি এখন আর ‘কত ঘণ্টা’ ঘুমাচ্ছেন তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ঘুমের ‘মান’ বা কোয়ালিটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে মুখ্য বিষয়।
গভীর ঘুম বা ‘স্লো-ওয়েভ স্লিপ’ কেন জরুরি? শরীরের কোষ মেরামত, শক্তি পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন গভীর ঘুম। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকেরই ঘুমের সময়টুকুতে শরীর নিজেকে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারছে না। ফলে দীর্ঘ সময় বিছানায় কাটালেও মস্তিষ্ক ও শরীর সতেজ হচ্ছে না।
মস্তিষ্ক কি এখনো ‘সতর্ক’ অবস্থায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের কাজ শেষ হলেও আমাদের মস্তিষ্ক অনেক সময় তা বুঝতে পারে না। শরীর বিশ্রামে গেলেও মস্তিষ্ক এক প্রকার ‘সতর্ক’ অবস্থায় থাকে। ঘুমের জন্য শরীরে কর্টিসল হরমোন কমে আসা এবং স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হওয়া জরুরি। কিন্তু আধুনিক জীবনের চাপ ও ডিজিটাল ডিভাইসের নীল আলো এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
যারা স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটান, তাদের ঘুমের গভীরতা তুলনামূলকভাবে কম। আমরা ফোন বন্ধ করলেও মস্তিষ্ক তখনো সেই তথ্যের উত্তেজনা বা প্রত্যাশার মধ্যে থাকে। এছাড়া সপ্তাহের একেক দিন একেক সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ নষ্ট করে দেয়।
সমাধানের পথ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে কিছু ছোট অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি: ১. ডিজিটাল ডিটক্স: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন (মোবাইল, ল্যাপটপ) থেকে দূরে থাকতে হবে। ২. আলোর নিয়ন্ত্রণ: রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া উচিত, যা মস্তিষ্ককে ‘বিশ্রামের সময় হয়েছে’ এমন সংকেত দেয়। ৩. ধারাবাহিকতা: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং জাগার অভ্যাস করা শরীরের স্বাভাবিক ঘড়িকে সচল রাখে। ৪. রুটিন অনুসরণ: ঘুমানোর আগে বই পড়া বা হালকা কোনো শান্ত কাজ করা মস্তিষ্ককে শান্ত হতে সাহায্য করে।
সব মিলিয়ে, সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজন কেবল সময় নয়, বরং মানসম্পন্ন এবং নিরবচ্ছিন্ন ঘুম। দিনের শেষে সঠিক পরিবেশ আর ছোট কিছু অভ্যাসই ফিরিয়ে দিতে পারে সেই হারিয়ে যাওয়া গভীর ঘুম।
