আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Elections) সমাপ্ত হওয়ার পর ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর এক সপ্তাহব্যাপী ব্যাপক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে অঞ্চলটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ঠেকাতে কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়েছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সম্ভাব্য এই যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব, তেল ও জ্বালানি স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র এবং সার্বিক যোগাযোগ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সুনির্দিষ্ট আকাশ হামলা চালানো হতে পারে। ইতোমধ্যেই গত সোমবার ইসরায়েলের সামরিক প্রধান জেনারেল ইয়াল জামির এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের মধ্যে সার্বিক সামরিক প্রস্তুতি ও সমন্বয় নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন প্রস্তাব ও সৌদি আরবের অবস্থান:
সম্ভাব্য এই বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়াতে কাতারের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা পুনরায় শুরুর জোর প্রচেষ্টা চলছে। এই মধ্যস্থতায় আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি সহযোগিতা করছে। অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, সাময়িক আক্রমণের শিকার বা ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের প্রবেশের পুনরায় অনুমতি দিতে ইরানকে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে দোহা। এর বিনিময়ে তেহরানের ওপর আরোপিত বেশ কিছু কঠোর মার্কিন অর্থনীতি ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিকল্প প্রস্তাব টেবিলে রাখা হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে নিশ্চিত করেছেন যে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের সাথে পরোক্ষ দরকষাকষি চলছে। তবে এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে।
ইরানের প্রস্তাবিত ৭ দিনের পরিকল্পনা ও হরমুজ প্রণালি সংকট:
অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক সংকট সামলাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এর অংশ হিসেবে ইরানের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ‘সাত দিনের পরিকল্পনা’ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের এই প্রস্তাব অনুযায়ী—যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে সমস্ত সামরিক সংঘাতমূলক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে, ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অন্যায্য নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং বিশ্ববাজারে দেশটির তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলে এর বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে ইরান এবং পরবর্তীতে অন্যান্য বৈশ্বিক অসংগতি ও আন্তর্জাতিক পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বৃহত্তর সমঝোতায় বসবে।
উলেখ্য, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ সমুদ্রপথে এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই অনায়াসে যাতায়াত করতো। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রণালি ঘিরে যেকোনো নতুন সামরিক উসকানি ও যুদ্ধসংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে।
সূত্র: শাফাক নিউজ, অ্যাক্সিওস, রয়টার্স
আর/কে
মন্তব্য করুন