হাম্মাদ- ইবি প্রতিনিধি:
মানুষ মাত্রই স্বপ্নাতুর। তারা সবাই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। কেউ কঠোর সাধনার মাধ্যমে তার স্বপ্নকে রুপ দেয় বাস্তবে। কেউবা ব্যর্থ হয় তাদের স্বপ্ন পূরণে। তবে এরমধ্যে রয়েছে একটি ব্যতিক্রম শ্রেণী। যারা একটি স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হলেও দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে অন্য একটি স্বপ্ন পূরণ করেন। এমনই একজন ব্যক্তি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ল অ্যান্ড ল্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের শিক্ষার্থী রোকনুজ্জামান রায়হান। সরকারী মেডিকেলে পড়তে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি এবার ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে (বিজেএস) উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার এ স্বপ্নাতুর জীবনের এ পথচলা তুলে ধরেছেন ‘এবং টিভি’র ইবি প্রতিনিধি হাম্মাদ তালুকদার।
পরিচিতি ও ব্যক্তিগত জীবন-
২০০১ সালে নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের মৌয়ামারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রায়হান। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। তার বাবা আনোয়ারুল হক একটি দাখিল মাদ্রাসার সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট (সহকারী সুপার) পদে চাকরিরত আছেন। তার মা রাহেনা বেগম একজন গৃহিণী।
শিক্ষাজীবন
বাড়ির কাছেই অবস্থিত মৌয়ামারী ডাঙ্গাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কৈমারী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মেডিকেল ভর্তিতে ব্যর্থ হয়ে এলএলবি ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে সামগ্রিক মেধা তালিকায় ৬ষ্ঠ স্থান অর্জন করে অনার্স সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছেন।
ক্যারিয়ারের গতিপথ ও জুডিশিয়ারিতে সফলতা-
ছোটোবেলা থেকেই রায়হানের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে সরকারী মেডিকেলে ভর্তির জোর প্রস্তুতিও নিয়েও মাত্র ০.৫ মার্কের জন্য ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে তিনি আইন বিভাগে পড়ে জজ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে চূড়ান্ত ভর্তির সুযোগ পেলেও তিনি তা ত্যাগ করে ইবির ল অ্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে ভর্তি হন। পরে অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ক্যাম্পাসের সিনিয়র সোহেল রানা (বর্তমানে রংপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট)-র নির্দেশনায় জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে কয়েকবার ওই সিনিয়রের সরাসরি বিচারিক কাজকর্ম ও নথিপত্র দেখে তিনি পড়াশোনার গতি আরও বাড়িয়ে দেন।

এদিকে একসময় নিজ বিভাগের কিছু কাছের জুনিয়রকে গাইডলাইন দেওয়া এবং পড়ানো শুরু করেন তিনি। পরবর্তী তা একটি ব্যাচে রুপ নেয়— যেখানে তিনি জুনিয়রদেকে বিভিন্ন কোর্স বোঝাতেন এবং পড়াতেন। এ প্রক্রিয়ায় তিনি অন্যদেরকে বোঝানোর জন্য নিজে ৮-১০টি বই ও রেফারেন্স ঘাঁটতেন। যা তাঁর কনসেপ্ট সম্পূর্ণ পরিষ্কার করতে এবং জুডিশিয়ারি পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতিতে সাহায্য করে। যেকারণে মাস্টার্সে পড়াকালীনই প্রথম চেষ্টাতেই সফল হন তিনি। গতকাল (২৩ সেপ্টেম্বর) ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) প্রকাশিত ফলাফলে তিনি সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
বাগান বিলাস ও মানসিক প্রশান্তি-
পড়াশোনার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতিও অমোঘ টান রায়হানের। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবস্থানকৃত লালন শাহ হলের দ্বিতীয় তলায় তিনি গড়ে তুলেছেন ছোট্ট বাগান। তাঁর বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, বাগানবিলাস, কাঠগোলাপ, অ্যাডেনিয়ামসহ প্রায় শতাধিক প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। দীর্ঘসময় পড়াশোনার পর যখনই তার মানসিক চাপ অনুভূত হতো তখনই তিনি চলে আসতেন বাগানে। কিছুক্ষণ পরিচর্যা করলেই যেন তার অস্বস্তিবোধ দূর হয়ে যেত। তার সফলতার পেছনে বাগানটি যেন একটি ‘প্রতিকী বন্ধু’।
অন্যান্য অর্জন ও লক্ষ্য-
এদিকে জুডিশিয়ারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি তিনি একটি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদেও উত্তীর্ণ হয়েছেন। জুডিশিয়ারিতে পদায়নের পূর্ব পর্যন্ত ব্যাংকটিতে কিছুদিন কর্মজীবন পার করার ইচ্ছা তার। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ারও তারা প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। এমনকি লেকচারার পদে আবেদন করার পর নিয়োগ পেলে সিভিল জজের পদবি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করারও ইচ্ছা রয়েছে তার।
উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে রোকনুজ্জামান রায়হান বলেন, সৃষ্টিকর্তার সাহায্যই আমাকে এ স্থানে পৌঁছেছে। তাই উনার দরবারে অনেক অনেক শুকরিয়া আদায় করছি। পাশাপাশি বাবা মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি। পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়সজন এবং সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একজন বিচারকের মূলকাজই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাই একজন বিচারক হিসেবে যেকোনো চাপ, প্রভাব বা অর্থের কাছে মাথা নত না করে নিরপেক্ষভাবে আইন ও বিবেক দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।
মন্তব্য করুন