অধিকৃত পশ্চিম তীরের ঐতিহ্যবাহী হেবরন শহরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অভিযানে অন্তত দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি পরিবার রাতারাতি ঘরছাড়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, সামরিক অভিযানে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসায়িক অবকাঠামো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি শহরটির প্রায় ২ লাখ ফিলিস্তিনি বাসিন্দার দৈনন্দিন চলাচলের ওপর চরম ও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত শুক্রবার হেবরনে এই পূর্ণমাত্রার অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এর আগের দিন শহরটির এক সামরিক চৌকিতে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর আকস্মিক হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত ও তিন সেনা আহত হন। পরবর্তীতে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ওই দুই হামলাকারী নিহত হলে নেতানিয়াহু হামলাকারীদের জন্মস্থান ও আশপাশের এলাকা মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।
অভিযানের ভয়াবহতা ও বাস্তুচ্যুতির চিত্র:
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের দাবি অনুযায়ী, চলমান সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার মানুষকে ঘরছাড়া করা হয়েছে। হেবরনের ‘আইন দেইর বাহা’ ও ‘ফারশ আল-হাওয়া’ এলাকাকে মূল লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সেখানকার প্রায় ০.৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে মোট ২ হাজার ৫০০ জন ফিলিস্তিনিকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দখলদার বাহিনী অনেক পরিবারকে তাঁদের নিজস্ব গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ না দিয়েই এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের অনেকে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর রাত কাটাচ্ছেন। ধ্বংসের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট বাড়িঘরে লাল রঙ দিয়ে চিহ্ন এঁকে রাখা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে বুলডোজার দিয়ে একের পর এক বহুতল ভবন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সড়ক ধ্বংসের দৃশ্য দেখা গেছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি ও নেতানিয়াহুর কড়া হুমকি:
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই তাণ্ডবকে পরিকল্পিত ‘জোরপূর্বক জনমিতি পরিবর্তন ও বাস্তুচ্যুত’ করার অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেবল মৌখিক নিন্দা জানানো যথেষ্ট নয়; হাজার হাজার মানুষকে স্থায়ীভাবে গৃহহীন হওয়া থেকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন যে, ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীরে সর্ববৃহৎ সামরিক অভিযান চালানোর যে সমন্বিত পরিকল্পনা রয়েছে, তা তিনি পর্যালোচনা করছেন। গত শনিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘আই২৪’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে তিনি ‘বড় ধরণের অশুভ চমক’ দেওয়া হবে বলে নতুন হুঁশিয়ারি দেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হেবরনের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারি অভিযোগ করেছেন, সামনেই ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন। উক্ত নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থি দল ও অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের (সেটলার) ভোট ও সমর্থন পেতেই নেতানিয়াহু এবং তাঁর বিতর্কিত মন্ত্রীরা এই অমানবিক রক্তক্ষয়ী অভিযান পরিচালনা করছেন।
সূত্র: বিবিসি
আর/কে
মন্তব্য করুন