জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির চড়া মূল্য এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাজুক পরিবেশের প্রতিবাদে ফ্রান্সে দেশজুড়ে শুরু হওয়া আন্দোলন নতুন করে চরম সহিংসতার রূপ নিয়েছে। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর ২০২৬) দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত বিক্ষোভে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। দিনের শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষভাগে রাজধানী প্যারিসসহ বড় বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের ভয়াবহতা ও গ্রেপ্তারের তথ্য:
বিবিসির প্রতিবেদন ও ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শনিবারের দেশব্যাপী এই গণবিক্ষোভে অন্তত ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে দেশটির শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, প্রকৃত আন্দোলনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখের বেশি। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ও বিশৃঙ্খলা রুখতে ফরাসি সরকার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে।
সারাদেশে আন্দোলনকারীদের তাণ্ডব ও পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কেবল রাজধানী প্যারিসেই ১৪২ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।
প্যারিস, মার্সেই ও আঞ্চলিক শহরগুলোর চিত্র:
রাজধানী প্যারিসে একটি মূল শান্তিপূর্ণ মিছিল শেষে হঠাৎ সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দফায় দফায় টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। বেশ কয়েকজন মুখোশধারী তরুণ শোরুমের কাজ ভাঙচুর করে এবং রাস্তার অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও মারাত্মক বস্তু ছুড়ে মারে।
দক্ষিণের ব্যস্ততম বন্দরনগরী মার্সেইয়ে ময়লার ডাস্টবিনে আগুন লাগিয়ে সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। বোর্দো শহরে ভবনের কাঠের পাটাতন খুলে নিয়ে সড়ক অবরোধ করার চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া লিওঁ শহরে নিষিদ্ধ ঘোষিত এলাকায় জোরপূর্বক জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে মারে।
আহতদের পরিস্থিতি ও ব্যাপক প্রাণহানি-ক্ষতি:
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের সাথে সংঘাত ও হাতাহাতিতে অন্তত ৫৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তুলুজ ও ক্লেরমঁ-ফেরাঁ শহরে দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। তুলুজে ২০ বছর বয়সী এক তরুণ বিক্ষোভকারীর হাতে হাতবোমার মতো বস্তু বিস্ফোরণে তাঁর কয়েকটি আঙুল বিছিন্ন হয়ে গেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
এর আগে গত সপ্তাহের একই ধরনের বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। সেই সময় ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও লুটপাটের অভিযোগে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফ্রান্সের বাণিজ্য ও শিল্প সংগঠনের তথ্যমতে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশজুড়ে ২ হাজারের বেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, রাজনৈতিক পারদ শীর্ষে:
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকট নিরসনে সরকারের ব্যর্থতা এবং শিক্ষা নীতির প্রতিবাদে সৃষ্ট এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফ্রান্সে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর তোপ ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
আর/কে
মন্তব্য করুন