ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নানা দাবি ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও অবসরকালীন পেনশন ও আবাসন সংকট, কোথাও উচ্চ শিক্ষা ও দুর্নীতির প্রতিবাদ, আবার কোথাও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে রাজপথে নেমেছেন সাধারণ মানুষ। এসব বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পূর্বের বিক্ষোভগুলোতে বড় ধরনের সহিংসতার রেকর্ড থাকায় ইউরোপের প্রধান প্রধান রাজধানীগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেকর্ড পরিমাণে জোরদার করা হয়েছে; মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ এবং কিছু এলাকায় সেনাসদস্যদেরও টহল দিতে দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সে রেকর্ড গ্রেপ্তার ও ব্যাপক সংঘর্ষ:
ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বড় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে ফ্রান্সে। দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান এসব অসন্তোষ দমনে দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংঘাতে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১ হাজার সদস্য আহত হয়েছেন। শুধু রাজধানী প্যারিসেই সংঘর্ষের জেরে প্রায় ১০০ জন বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আলবেনিয়ায় সরকারি ভবনে হামলা ও কাঁদানে গ্যাস:
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শনিবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। তীব্র উত্তেজনার মুখে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে চলা এই ধারাবাহিক সংঘর্ষের অংশ হিসেবে এদিন সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে এবং ডজন ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। দেশটির প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে, বিক্ষোভ ও পুলিশের লাঠিপেটায় উভয় পক্ষের তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
ইতালির বড় শহরগুলোতে ধরপাকড়:
ইতালির মিলান, রোম, তুরিন, নেপলস, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সসহ প্রধান প্রধান শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় কিছু উগ্র বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল, পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে ইতালি পুলিশ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার আটটি শহরের বিক্ষোভ থেকে সরাসরি ৯ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আটককৃতদের মধ্যে অন্তত ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর-কিশোরী রয়েছে।
স্পেন ও পর্তুগালে অধিকার আদায়ের আন্দোলন:
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে শত শত পেনশনভোগী ও তাদের সমর্থকরা অবসরকালীন সামাজিক অধিকার রক্ষার দাবিতে সুশৃঙ্খল মিছিল করেছেন। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন বৃদ্ধি, ন্যূনতম পেনশনকে ন্যূনতম মজুরির সমপরিমাণ করা, নারী ও পুরুষের মধ্যকার পেনশন বৈষম্য কমানো এবং সরকারি পেনশন ব্যবস্থা কোনোভাবেই যেন বেসরকারীকরণ করা না হয়—সেটি ছিল তাদের প্রধান দাবি।
অন্যদিকে, পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করার দাবিতে রাজপথে সোচ্চার হন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া এসব আন্দোলন মূলত আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়, মৌলিক সামাজিক অধিকার এবং জনবিরোধী সরকারি নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সূত্র: ইউরোনিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি
আর/কে
মন্তব্য করুন